পবিত্রতার বিভ্রম

« <
/ 19
> »

দেওয়ার আগে ‘রাহমান’ ও ‘রাহীম’ (পরম করুণাময় ও দয়ালু) হিসেবে বিশেষিত করেছেন। আর ধর্মের সারবত্তা হলো সেই করুণারই এক প্রতিচ্ছবি। কিন্তু মানুষ যখন ভালোবাসার চেয়ে ভয়কে বড় করে দেখে, তখন সে ধর্মকে প্রশান্তির পরিবর্তে এক বিভীষিকায় রূপান্তর করে। ইমাম আলী (রা.) বলেন—

“الناسُ ثَلاثَةٌ: عابِدٌ خائفٌ، وَعَبدٌ مُطيعٌ، وعالِمٌ واعٍ”

“মানুষ তিন প্রকার: ভীত ইবাদতকারী, অনুগত দাস এবং সচেতন জ্ঞানী।”

ধর্মের মূল প্রাণ হলো রহমত বা দয়া; জবরদস্তি কিংবা কঠোরতা নয়। এমন প্রতিটি ডাক যা ধর্মের নামে আসে অথচ যার অন্তরে রহমতের বীজ নেই, তা আসলে ধর্মের মূল শিক্ষা থেকে এক বড় ধরনের বিচ্যুতি—তা সেটি যত সুন্দর স্লোগান বা দলিলের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকুক না কেন। রহমত কেবল কোনো আবেগপ্রবণ স্লোগান নয়, বরং এটি নবীদের রিসালাতের এক মৌলিক অস্তিত্বগত নীতি। নবীরা দুনিয়াতে কোনো নতুন জগত যোগ করতে আসেননি, বরং মানুষের মাঝে সেই আদি ও অকৃত্রিম মমতা জাগিয়ে তুলতে এসেছিলেন, যার মাধ্যমে সচেতনতা পূর্ণতা পায় এবং হৃদয়ের কঠোরতা দূরীভূত হয়।

রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন ‘রাহমাতুল্লিল আলামীন’ (বিশ্বজগতের জন্য রহমত)। এটি কেবল শাব্দিক দয়া নয়; বরং তাঁর অস্তিত্বই ছিল জীবনের এক নতুন সঞ্জিবনী শক্তি। যারা তাঁর নিকটে এসেছে তারা প্রশান্তি অনুভব করেছে, আর যারা তাঁর বিরোধিতা করেছে তাদের ছুড়ে ফেলা হয়নি, বরং সত্য বোঝার আহ্বান জানানো হয়েছে। ধর্ম যখন তার আদি উৎসে ফিরে যায়, তখন তা বিচার করার পরিবর্তে প্রতিকার করে এবং মানুষকে সমাজচ্যুত করার পরিবর্তে সঠিক পথের দিশা দেয়।

ধর্মের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাধি হলো একে ‘সত্যের নামে’ ঘৃণা ছড়ানোর হাতিয়ার বানানো, কিংবা ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক ও প্রতীকী যুদ্ধের ঝাণ্ডা হিসেবে ব্যবহার করা। তখন কেবল নামের পরিবর্তন ঘটে, কিন্তু ভেতরের সারবস্তু একই থাকে—যা হলো ‘পবিত্রতার বিভ্রম’। এই বিভ্রমই মূলত ঐশী বাণী ও ব্যক্তিগত স্বার্থকে গুলিয়ে ফেলে; সত্যের প্রতি অনুরাগ আর আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষাকে এক করে দেয়। মনে রাখতে হবে, রহমত বা দয়া ধর্মের দুর্বলতা নয়, বরং এটি ধর্মের এক ‘সচেতন শক্তি’। কারণ যে দয়া করে, সে সত্যকে নিজের ক্ষুদ্র গণ্ডির চেয়েও অনেক বিশাল আকারে দেখতে পায়। তাই মানুষকে না বুঝে ধর্মকে বোঝা অসম্ভব; মানুষের হৃদয় যত প্রশস্ত হয়, আল্লাহর প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গিও ততটাই

« <
/ 19
> »