পবিত্রতার বিভ্রম
বিষয়: আত্ম-উন্নয়ন, বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণ ও ধর্মীয় সমাজতত্ত্ব
জেঙ্কির সালেহ মুখতার আদ-দাক্বুক্বলী
দারুত তারজামাহ
অনূদিত
ভূমিকা
আকাশের পানে চোখ মেলে মানুষ যেদিন প্রথম জীবনের সার্থকতা আর ধর্মের স্বরূপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল, ঠিক সেদিনই ধর্মের জন্ম হয়েছিল। শুরুতে ধর্ম কোনো নিছক আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি কিংবা কতগুলো জড় ও প্রাণহীন বিধানের নাম ছিল না; বরং তা ছিল শূন্যতার বিরুদ্ধে এক সচেতন চিৎকার এবং পরম সত্য ও পরম ন্যায়ের সন্ধানে এক পবিত্ৰ ফিতরাত বা সহজাত প্রবৃত্তির স্পন্দন।
কিন্তু ধর্ম যখন মানুষের বাস্তব জীবনে নেমে এলো, তখন থেকেই তা মানুষের খেয়ালখুশি ও প্রবৃত্তির রঙে রঞ্জিত হতে শুরু করল। অনেক ক্ষেত্রে তা এমন এক শক্তিতে রূপ নিল, যা মানুষকে আলোর বদলে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। স্রষ্টার পথের পরিবর্তে তা হয়ে উঠল মানুষের আত্মপূজা ও পার্থিব স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার। মানব ইতিহাস এই বেদনাদায়ক রূপান্তরের সাক্ষী হয়ে আছে। এমন কোনো জাতি নেই, যারা এই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি—যেখানে ধর্মের মূল চেতনা উল্টে গিয়ে এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। ফলে ঐক্য তৈরির বদলে ধর্ম হয়ে ওঠে বিভেদের দেওয়াল, আত্মশুদ্ধির বদলে শোষণের হাতিয়ার আর জীবন্ত উপলব্ধির বদলে অন্ধ পূজার নামান্তর। এভাবেই জন্ম নেয় ‘বিকৃত ধর্মীয় মানসিকতা’—বিশ্বাসের এমন এক রুগ্ণ রূপ, যা ধর্মের বহিরাবরণ ধরে রাখলেও এর মূল আত্মাকে হারিয়ে ফেলে।
আসলে ‘দীন’ বা ধর্ম হলো ওহী, আর ‘তাদাইয়ুন’ বা ধর্মীয় জীবনাচার হলো সেই ওহী সম্পর্কে মানুষের পাঠ ও উপলব্ধি। ধর্ম তার আপন মহিমায় ধ্রুব ও অপরিবর্তনীয়, কিন্তু মানুষের ধর্মীয় আচরণ একান্তই মানবিক—যা সংস্কৃতি, সমাজ, মনস্তত্ত্ব ও স্বার্থের দ্বারা প্রভাবিত। যখন এই ঐশী ধর্ম আর মানবিক আচরণের মধ্যকার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়, তখনই বিচ্যুতি ও বিকৃতির সূচনা ঘটে। ফলে বিশ্বাস পরিণত হয় অভ্যাসে, ইবাদত হয়ে পড়ে প্রাণহীন এক বোঝা, সুদৃঢ় প্রত্যয় রূপ নেয় উগ্রবাদে আর পরহেজগারি হয়ে ওঠে অহংকারের নামান্তর।
যুগে যুগে আমরা এমন ইবাদতকারী দেখেছি যাদের হৃদয়ে দয়া নেই, এমন ফকীহ্ দেখেছি যাদের মাঝে জনকল্যাণের চেতনা নেই, এমন সুফী দেখেছি যাদের কোনো সামাজিক দায়বদ্ধতা নেই এবং এমন মুজাহিদ দেখেছি যাদের কর্মে কোনো কল্যাণ নেই। এদের সবার মাঝে একটি বিষয়ে অদ্ভুত মিল রয়েছে—তারা সবাই মনে
