পবিত্রতার বিভ্রম

« <
/ 19
> »

ইবাদত খোদ স্রষ্টাকেই ভুলিয়ে দেয়। ধর্ম মানে কেবল রাশি রাশি নামাজ আর রোজা নয়; বরং ধর্ম হলো যত্ন, নীতি-নৈতিকতা আর নিজের বিবেকের কাছে স্বচ্ছ থাকা। একজন মানুষের ধর্মীয় বিচ্যুতি কেবল তার বাহ্যিক কর্ম দিয়ে মাপা যায় না, বরং তা মাপা হয় সেই শূন্যতা দিয়ে—যা ইবাদতের সময় তার হৃদয়ে বিরাজ করে।

 

এই পৃথিবীতে এখনো এমন সরল ও অকৃত্রিম বিশ্বাসী মানুষ আছেন, যাদের ঈমান রিয়া (লোকদেখানো ইবাদত) কিংবা জাগতিক স্বার্থের কলুষতায় পঙ্কিল হয়নি। মূলত এরাই সেই আলোকবর্তিকা, যাদের মাধ্যমে ধর্মের প্রকৃত মাধুর্য পুনরায় ফিরে পাওয়া সম্ভব। এই কিতাবটি কেবল একটি বিনীত প্রচেষ্টা—আমাদের এটি মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য যে, আল্লাহর ইবাদত কেবল দেহ দিয়ে নয়, বরং হৃদয় ও বুদ্ধিবৃত্তির সমন্বয়ে করতে হয়। যেন আমরা পুনরায় সেই ধর্মের দিকে ফিরে যেতে পারি যা আল্লাহ চেয়েছিলেন—একটি প্রদীপ যা পথ দেখাবে, এমন কোনো আগুন নয় যা সবকিছু পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে।

 

প্রথম অধ্যায়: ধর্মের সারসত্তা ও মূল উদ্দেশ্য

 

১. ধর্ম… আদি ফিতরাত বা সহজাত প্রবৃত্তি

ধর্ম ইতিহাসের পাতায় আকস্মিক কোনো ধারণা নয়; বরং এটি মানবসত্তার মূল বুননেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষ যেদিন থেকে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়েছে, সেদিন থেকেই সে নিজের ভেতর এমন এক কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছে যা অন্য সব আওয়াজ থেকে ভিন্ন। সেই সুর তাকে কেবল জাগতিক বেঁচে থাকার ঊর্ধ্বে এক মহত্তর আহ্বানে সাড়া দিতে বলে; যা কেবল ভোগ-বিলাস কিংবা ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে এক অনন্য সার্থকতা খুঁজে ফেরে। এই কণ্ঠস্বরকেই পবিত্র কোরআন ‘ফিতরাত’ হিসেবে অভিহিত করেছে:

فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا

“আল্লাহর সেই ফিতরাত (সহজাত প্রকৃতি), যার ওপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন।” [সূরাহ আর-রূম: ৩০]

সুতরাং ফিতরাত হলো বিশ্বাসের সেই আদি স্ফুলিঙ্গ, আর ধর্ম হলো সেই ফিতরাত যখন সচেতনভাবে প্রস্ফুটিত হয়—তারই এক পূর্ণাঙ্গ রূপ।

এ কারণেই আমীরুল মুমিনীন আলী (রা.) ‘নাহজুল বালাগা’-তে বলেছেন—

“بَعَثَ اللَّهُ الأَنْبِيَاءَ لِيُنِيرُوا لَهُمْ دَفَائِنَ الْعُقُولِ” 

“আল্লাহ নবীদের পাঠিয়েছেন যেন তাঁরা মানুষের বিবেকের ভেতরে চাপা পড়া সম্পদকে (সুপ্ত জ্ঞানকে) আলোকিত ও উন্মোচিত করেন।”

অর্থাৎ, ধর্ম মানুষের অন্তরে বাইরে থেকে কোনো বিজাতীয় বস্তু রোপণ করে না; বরং মানুষের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা চিরন্তন সত্যকেই জাগিয়ে তোলে। এটি

« <
/ 19
> »