অর্জিত হয় না; বরং তা অর্জিত হয় একমাত্র আল্লাহর দাসত্বের ক্ষেত্রে চরম সত্যবাদিতার মাধ্যমে।
পবিত্রতাকে ক্ষমতায় রূপান্তরের কলাকৌশল
যখন পবিত্রতাকে আধিপত্য বা ক্ষমতায় রূপান্তর করার হীন উদ্দেশ্য থাকে, তখন তা কেবল পেশিশক্তি দিয়ে করা হয় না; বরং এর শুরু হয় ‘বিভ্রম’ তৈরির মাধ্যমে। একজন স্বৈরাচারী কেবল তার ইচ্ছা চাপিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হয় না, বরং সে মানুষকে এটি বিশ্বাস করাতে সচেষ্ট হয় যে—তার ইচ্ছাই মূলত আল্লাহর ইচ্ছা। আর এখান থেকেই ‘মানুষকে উপাস্যে পরিণত করার’ (তাইলীহুল ইনসান) প্রক্রিয়ার সূচনা হয়। তখন কোনো ধর্মীয় প্রতীক বা নেতাকে এমন এক মাধ্যমে পরিণত করা হয় যার সমালোচনা অসম্ভব; তাকে জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে এমন এক রেফারেন্স হিসেবে দাঁড় করানো হয়, যেখানে তার বিরোধিতা করা মানে স্বয়ং বিশ্বাসের বিরোধিতা করা।
এই পবিত্রতার বলয় মূলত তিনটি প্রধান কৌশলে তৈরি করা হয়:
প্রথমত: ধর্মীয় ভাষ্যের একচেটিয়া অধিকার: যখন আল্লাহর পরিচয় বা জ্ঞানকে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়, তখন ধর্মীয় চেতনা হয়ে পড়ে একটিমাত্র ব্যাখ্যার কাছে জিম্মি। সেখানে ধর্মের মর্ম উপলব্ধিতে মানুষের বিবেক বা আকলের অংশগ্রহণকে রুদ্ধ করা হয়। এভাবেই ইজতিহাদ ও গবেষণার পথ বন্ধ হয়ে যায় এবং ধর্ম একটি বদ্ধ সংস্থায় পরিণত হয়—যেখানে আসমানী বাণীর দোহাই দিয়ে কথা বলার অধিকার রাখা ঐ ‘কর্তৃপক্ষ’ ছাড়া অন্য কারো কণ্ঠস্বর শোনা যায় না।
দ্বিতীয়ত: প্রতীক ও আচারের অপব্যবহার: ইতিহাসে বহুবার ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানগুলোকে আত্মিক জাগরণের পরিবর্তে প্রভাব-প্রতিপত্তি টিকিয়ে রাখার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। যখনই ইনসাফ বা ন্যায়ের চেতনা স্তিমিত হয়েছে, তখনই জনগণের বিবেককে শান্ত রাখার জন্য আনুষ্ঠানিকতার আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। আইম্মাহ্ (আ.) এই পথ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন; কারণ কোনো ধর্মীয় আচার যখন তার নৈতিক আবেদন হারিয়ে ফেলে, তখন তা জাগরণের পরিবর্তে বিভোর করার (মাদকতার মতো) উপায়ে পরিণত হয়। স্বয়ং ইমাম হুসাইন (আ.) এই বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধেই রুখে দাঁড়িয়েছিলেন—যখন তিনি এমন এক স্বৈরাচারী শাসনের মোকাবিলা করেছিলেন যারা ধর্মের স্লোগান দিলেও ধর্মের নামেই জুলুম চালাচ্ছিল।
তৃতীয়ত: আনুগত্যের নামে বিবেক দমন: ধর্মকে যখন সচেতনতাহীন এক অন্ধ আত্মসমর্পণের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন স্বৈরাচারী শাসনও ‘ইবাদত’ হিসেবে গণ্য হতে থাকে। অথচ আহলে বাইতের যুক্তিতে আনুগত্য কেবল তখনই পবিত্র, যখন তা অন্তর্দৃষ্টি থেকে উৎসারিত হয়।
