‘আপনি আপনার মনে যা লুকিয়ে রাখছেন’ (وَتُخْفِي فِي نَفْسِكَ)—এর ব্যাখ্যায় তারা সেই প্রেমকেই লুকিয়ে রাখার কথা বলে।
এই নির্বোধ ও ভিত্তিহীন ব্যাখ্যাটি সেই অনির্ভরযোগ্য বর্ণনার ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রকৃতপক্ষে যায়িদ ও যয়নাবের দাম্পত্য কলহ এবং পরবর্তীতে আল্লাহর নির্দেশে নবীজির সাথে যয়নাবের বিবাহের যে বিধান আসছিল, সেই ঐশী সিদ্ধান্তটিই নবীজি (সা.) সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে মনে লুকিয়ে রেখেছিলেন।
এই ভিত্তিহীন দাবিটি মূলত দুটি জোরালো কারণে মিথ্যা প্রমাণিত হয়:
প্রথমত: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে যয়নাব (রা.)-এর বিবাহের মাধ্যমে আরবের সেই প্রাচীন কুপ্রথাটি ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন, যেখানে পালক পুত্রের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ ছিল। পবিত্র কুরআনের আয়াত এ বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট:
لِكَيْلَا يَكُونَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ حَرَجٌ فِي أَزْوَاجِ أَدْعِيَائِهِمْ إِذَا قَضَوْا مِنْهُنَّ وَطَرًا ۚ وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ مَفْعُولًا
“…যাতে মুমিনদের জন্য তাদের পালক পুত্রদের স্ত্রীদের (বিয়ের) ব্যাপারে কোনো সংকীর্ণতা না থাকে, যখন তারা তাদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। আর আল্লাহর আদেশ কার্যকর হবেই।” [সূরাহ আল-আহযাব: ৩৭]
দ্বিতীয়ত: সুস্থ বিবেক কখনো এটা মেনে নিতে পারে না যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে তাঁর ফুফাতো বোন যয়নাবের সাথে যায়িদের বিয়ের মধ্যস্থতা করবেন যদি তিনি নিজেই তাকে ভালোবাসতেন। বরং সাধারণ যুক্তিতেও কি এটা সম্ভব যে, তিনি যখন কুমারী ছিলেন তখন তাঁর প্রতি নবীজির কোনো আগ্রহ ছিল না, আর যখন তিনি অন্য একজনের ঘর করা/তালাকপ্রাপ্তা নারী হলেন, তখন নাকি তাঁর প্রতি নবীজির আসক্তি জাগল! এমন দাবি একান্তই অযৌক্তিক।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, অনেক খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারক ও প্রাচ্যবিদ (অরিয়েন্টালিস্ট) এই ভুল তাফসীরগুলো লুফে নিয়েছে এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র চরিত্রের ওপর কালিমা লেপন করতে একে চরমভাবে ব্যবহার করেছে। অথচ তিনি এই সমস্ত অপবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে আগ্রহী পাঠক ডক্টর মুহাম্মাদ হুসাইন হাইকল-এর ‘হায়াতু মুহাম্মাদ’ গ্রন্থটি দেখতে পারেন।
এই গ্রন্থের ভূমিকা হিসেবে আমি এই আলোচনাটুকুই যথেষ্ট মনে করছি। মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করছি—তিনি যেন আমার এই প্রচেষ্টাকে কেবল তাঁর সন্তুষ্টির জন্য কবুল করেন। এটি যেন আমাদের এই বিশ্বাসী প্রজন্মের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে এবং তারা যেন তাদের পরিবারকে ইসলামের সুমহান আদর্শ, সত্য, শক্তি আর সুন্দরের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।
—
