সিলেটি সাগা

« <
/ 10
> »

গেল বছরে যখন ওর মালিক পঁচিশ বছর লন্ডনে কাটিয়ে বাপ-মাকে দেখতে দেশে আসে তখন আমাকে জোর নিমন্ত্রণ জানিয়ে বলে, তার রেস্তোরাঁ আছে, ফ্ল্যাট আছে; আমি যদি দয়া করে পদধূলি— হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ।

কোথায় কী? আমি ভেবেছিলুম, সেই যে চল্লিশ বছর পূর্বেকার টিলবারি ডকের সিলেটি রেস্তোরাঁ— যার কাহিনি আপনাদের শুনিয়েছি— সেই ধরনের গরিবগুরবোর অটলই (হোটেলের সিলেটি উচ্চারণ; তবে সিলেটিতে অ্যাকসেন্ট আছে বলে সেটা পড়বে অ-র ওপর) হবে। তবে কি না, নিতান্ত মহারানির আপন নগরের মধ্যিখানে থানা গেড়েছে যখন, তবে হয়তো দেয়াল-ছাদে দু-এক পলস্তরা পাউডার-রুজ মাখিয়ে নিয়েছে।

কোথায় কী? পরিপাটি ছিমছাম পশ, শিক। বাদবাকি সবকিছু পর্যবেক্ষণ করার পূর্বেই দূর থেকে মালিক আমাকে দেখতে পেয়েই ছুটে এসেছে— “আউকা, আউকা; বউকা বউকা (আসুন, আসুন; বসুন, বসুন)।” তার পর দিল ছুট রেস্তোরাঁর গর্ভগৃহের দিকে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য বউকে নিয়ে আসতে।

টেবিল-ক্লথ, ন্যাপকিন মুরমুরে পয়লা নম্বরি আইরিশ লিনেনের, ফুলদানিতে যেন বাগান থেকে সদ্য তোলা, শিশির-ভেজা গোলাপ, ছুরি-কাঁটা তথা যাবতীয় কাটলারি যেন মোগল আমলের খাঁটি রুপোর, আর গেলাস-বৌল এমনই স্বচ্ছ যে ভয় হল যে দুর্যোধনের মতো স্ফটিককে জল ভেবে, আমিও এগুলোর দু-একটা দেখতে না পেয়ে ভেঙে ফেলি!

ডানদিকে কাচে ঘেরা একটি চৌকো কুঠরি। ভিতরে সারি সারি শেলফে সাজানো দুনিয়ার খাসা খাসা মদ্যাদি। বোতলের আকার-প্রকার রঙ-লেবেল দেখেই বোঝা যায়। কুঠরির মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটি খুবসুরত জোয়ান ছোকরা ন্যাপকিন দিয়ে ওয়াইন, শ্যাম্পেন, বিয়ার-মাগ সাফসুতরো করছিল এবং মাঝে মাঝে আমার দিকে আড়নয়নে তাকাচ্ছিল। ছোকরার মুখের আদল, দেহের গঠন সিলেটির মতো। কিন্তু রঙটা? গোরাদের মতো ফর্সা নয়, আবার সিলেটির মতো শ্যাম-হলদেও নয়। সমাধান কিন্তু সহজ। গলা বাড়িয়ে সিলেটিতে শুধোলুম, “ভাই সাহেব, আপনার দেশ কোথায়?”

গোটা কয়েক গেলাস ভেঙে ফেলেছিল আর কি! গলার আওয়াজ হোঁচট খেতে খেতে, খাবি খেয়ে খেয়ে, পড়িমরি হয়ে বলল, “জি, জি, জি; আমি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের।… এখানে যারা কাজ-কাম করে সবাই সিলেটি।” (আমরা মারোয়াড়িদের দোষ দিই; তারা শুধু দেশের ভাইয়াদেরই চাকরি দেয়। সমস্যাটার সমাধান এখনও করতে পারিনি।)

ইতোমধ্যে মালিক এসে গেছেন। তাঁর গৃহিণীর— মেমসাহেবার প্রথম কথা কটি শুনেই আমার মনে সন্দেহ হল, যদিও এর ইংরেজি উচ্চারণ উত্তম— অন্তত আমার চেয়ে ভালো— তবু ইনি বোধহয় কন্টিনেন্টাল। ভারি মিষ্টি স্বভাবের, লাজুক, স্বল্পভাষী রমণী। মালিকের মাথায় হঠাৎ কী যেন আচমকা ভাবোদয় হল। বলল, “আপনি তো একদা জর্মনিতে পড়াশুনো করেছিলেন; এখনও নাকি ওই দেশের ভাষা বলতে পারেন। ইনি (বউয়ের দিকে তাকিয়ে) খাঁটি জর্মন।”

এতক্ষণ

« <
/ 10
> »