বললেই হত। মেমও সঙ্গে সঙ্গে জর্মন বলতে আরম্ভ করল। ওর উচ্চারণ থেকে মনে হল সে ভুর্টেমবার্গ প্রদেশের মেয়ে।
সোমদেবের চরম কৃপাই বলতে হবে! যে প্লেনে জর্মনি থেকে লন্ডন এসেছিলুম সেটাতে ওই ভুর্টেমবার্গ প্রদেশের মোলায়েম ওয়াইন সস্তায় বিক্রি হচ্ছিল। লন্ডনে পৌঁছে শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ডেরা পাব তা তো জানিনে। যদি-স্যাৎ কাজে লেগে যায়। তাই এক বোতল কিনে নিয়েছিলুম। আর যাবে কোথা! এক কোণে গুঁই করে রাখা লাগেজ থেকে বোতলটি বের করে ম্যাডামের সামনে রেখে বললুম, “এই নিন। সুম ভোল জাইন, আ ভত্র সান্তে— হেয়ার ইজ টু ইউ—” এসব তান্ত্রিক মন্ত্রের অর্থ আমি এখনও সঠিক জানিনে। তবে মোটামুটি দাঁড়ায়— এটি পান করে আপনার স্বাস্থ্যের উন্নতি হোক, আপনার সর্বমঙ্গল হোক ইত্যাদি। উভয় পক্ষ উভয়ের একই মঙ্গল কামনা করেন। মদ্যপান করে স্বাস্থ্যের উন্নতি হয় কি না জানিনে— গত যুদ্ধে ফ্রান্স হেরে যাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট পেতাঁ যখন প্রথম বক্তৃতা দেন, তখন তিনি বলেন, অত্যধিক মদ্যপান হেতু ফরাসি সেপাই ঠিকমতো লড়তে পারেনি— কিন্তু এটাই রেওয়াজ এবং ম্যাডামের চোখ ছলছল করে উঠল। কোথাকার কোন ইন্ডিয়ান— তার দেশের জিনিস, এ স্থলে প্রতীক বলতে হবে, এনেছে। এটা কি কম কথা! ভাবুন, আপনি নিউজিল্যান্ড বা ওসলোতে। সেখানে কেউ নিয়ে এল আপনার জন্য পাটিসাপটা, ক্ষীরের মালপোয়া, দেদো সন্দেশ! তদুপরি সে বাঙালি নয়।
ইতোমধ্যে দুটি-একটি করে খদ্দের আসতে আরম্ভ করেছে। তার থেকে বুঝলুম, রাত হয়ে আসছে। আমার কাছে আশ্চর্য বোধ হয় যে আমরা সূর্যচন্দ্র দেখে সময়টা কী এবং তার চেয়েও বড় কথা মানুষের আচরণ তার কাজ-কারবার স্থির করি। যেমন সূর্য অস্ত যাচ্ছেন; অতএব এখন রাস্তার ভিড় কমতির দিকে। আর বিলেতে জানালার পর্দা সরিয়ে দেখলেন রাস্তায় প্রচণ্ড ভিড়। নিশ্চয়ই লাঞ্চের সময়, অতএব দুপুর।
ক্রমে ক্রমে রেস্তোরাঁ ভর্তি হয়ে গেল। কিন্তু কী আশ্চর্য! সব গোরার পাল। একটি মাত্র ইন্ডিয়ান নেই। চল্লিশ বছর পূর্বে টিলবারির রেস্তোরাঁয় দেখেছিলুম বেশিরভাগ সিলেটি খদ্দের; মাত্র দু-একটি গোরা। এখানে দেখি ‘সব লাল হো গয়ো’।
মালিক ওয়ার্ল্ড অ্যাটলাসের মতো বিরাট একখানা মেনু এগিয়ে দিয়ে বলল, “কী খাবেন, হুকুম দিন।”
আমি বললুম, “প্লেনে বিস্তর ঝাঁকুনি খেয়েছি আর কী খাব, কও। বমি করেছে বেশ কয়েকজন। তুমি-আমি নিতান্ত সিলেটের লোক। জন্ম থেকে হাওর-বিলে নৌকায় ভিতরে-বাইরে নাগরদোলার দোল খেয়ে শিলং যাবার সময় আচমকা পাহাড়ি মোড়, হেয়ার পিন টার্ন হজম করে করে সি-সিক, এয়ার-সিক, ল্যান্ড-সিক হইনে। কিন্তু এবারে আমি কাবু। গা গুলোচ্ছে, বমি না করলেই রক্ষে। প্লেনে ওঠার আগে যা-সব
