সিলেটি সাগা

« <
/ 10
> »

০১.

“অ ডুরা! কুনার সাবরে আরক কটরা ছালন দেও।”

অতিশয় বিশুদ্ধ সিলেটি উচ্চারণে বাক্যটি উচ্চারিত হইল। আমি অবশ্য তার জন্য প্রস্তুত ছিলুম। যদ্যপি দেশ: লন্ডনের টিলবারি ডক; কাল: ১৯৩১; পাত্র: রেস্তোরাঁর মালিক। সে আমলে খাঁটি বিলিতি হোটেল-রেস্তোরাঁতে যে অখাদ্য নির্মিত হইত সেটা হটেনটটীয় পর্যায়ের। কথায় বলে, ওট নামক বস্তুটি স্কটল্যান্ডে খায় মানুষ, ইংলন্ডে খায় ঘোড়া। কিন্তু ওই আমলে লন্ডনের পোশাকি খানাও স্কটল্যান্ডের ঘোড়া পর্যন্ত খেতে রাজি হইত না— এই আমার বিশ্বাস। তাই আমি লন্ডনের লাঞ্চকে বলতুম লাঞ্ছনা আর সাপারকে বলতুম ‘Suffer’!

রবীন্দ্রনাথ লন্ডনে এসেছেন শুনে তাঁকে প্রণাম জানিয়ে যখন রাস্তায় নেমেছি তখন হঠাৎ এক সিলেটি দোস্তের সঙ্গে মোলাকাত। আলিঙ্গন কুশলাদির পর দোস্ত শুধাল, “অত রোগা কেন?” একে দুর্দান্ত শীত, তদুপরি লন্ডনের গুষ্টির-পিণ্ডি-চটকানো রান্না। সংক্ষেপে বলল, “চল।” এতদিন পরে সব ঘটনা আর মনে নেই তবে বাসে করে যে অনেকখানি পথ যেতে হয়েছিল সেটা স্পষ্ট মনে আছে। মোকামে পৌঁছে ভালো করে বেয়ারিং পাবার পূর্বেই দেখি, একটি ছোটখাটো রেস্তোরাঁর মাঝখানে আমি দাঁড়িয়ে এবং কানে গেল পূর্বোক্ত, “অ ডুরা—” ইত্যাদি, যার অর্থ, “ও ডোরা, কোণের সাহেবকে আরেক বাটি ঝোল দাও।”

হালে কাগজে পড়লুম, বিলেতে যেসব পাক-ভারতের রেস্তোরাঁ আছে তার শতকরা ৮০ ভাগ সিলেটিরা চালায়। অবশ্য ওই চল্লিশ বছর পূর্বে বিলেতে অত ঝাঁকে ঝাঁকে পাক-ভারতীয় রেস্তোরাঁ ছিল না; তবে সে-রাত্রেই জানতে পাই, যে-কয়টি আছে পনেরো আনা সিলেটিদের। এমনকি লন্ডনের নামকরা হতচ্ছাড়া তালু-পোড়া দামের এক ভারতীয় রেস্তোরাঁর শেফও সিলেটি।

ইতোমধ্যে দোস্ত শশাঙ্কমোহন অটলালার (হোটেলওয়ালার) সঙ্গে বে-এক্তেয়ার গালগল্প জুড়ে দিয়েছেন— আহা, যেন বহু যুগের ওপার হতে ‘Long lost’ ভ্রাতৃদ্বয়ের পুনর্মিলন। শশাঙ্ক আমাকে অটলালার পাশের একটা টেবিলের কাছে বসবার ইঙ্গিত দিয়ে আবার তার ভ্যাচর ভ্যাচরে ফিরে গেল। একটা দরজা খুলে যেতে দেখি বেরিয়ে এল একটি প্রাপ্তবয়স্কা মেম। হাতের ট্রের উপর রাইস, কারি, ডাল, ভাজাভুজি। আমাদের দিকে নজর যেতেই মৃদুহাস্য করে “গুড ইভনিং” বলে বয়সের তুলনায় অতি স্মার্ট পদক্ষেপে গটগট করে প্রথম অন্যান্য খদ্দেরদের রাইসকার্যাদি দিয়ে সর্বশেষে কোণের সাহেবের টেবিলের উপর তার ছালনের কট্রা রাখল। ইনিই তা হলে ডোরা!… জনা আষ্টেক খালাসি পরম পরিতৃপ্তি সহকারে সশব্দে, ছুরি-কাঁটার তোয়াক্কা না করে খেয়ে চলেছে। আরও দু জন গোরা একান্তে বসে ওই খাদ্যই রসিয়ে রসিয়ে উপভোগ করছে।

ডোরা ফিরে আসতে অটলালা তার ক্যাশ ছেড়ে এল। আমরা চারজন এক টেবিলে বসলুম। অটলালা সঙ্গে সঙ্গে বলল, “আমরা তো বেশি পদ রাঁধি না— আমাদের গাহক তো সবই খালাসি, দু

« <
/ 10
> »