সিলেটি সাগা

« <
/ 10
> »

একজন গোরা মাঝেমধ্যে। কিন্তু আপনারা অতদূর থেকে মেহেরবানি করে এসেছেন। ভালোমন্দ কিছু করতে হয়।” আমাদের আপত্তি না শুনে দুজনা রান্নাঘরে চলে গেল।

শশাঙ্ক বলল, “আশ্চর্য, কুড়ি বছর হয়ে গেল এই আম্বরউল্লা এ-দেশে আছে, তবু একবর্ণ ইংরেজি শিখতে পারেনি। ওদিকে ওর বউ ডোরা দিব্যি সিলেটি বলতে পারে। খালাসি গোরা সব খদ্দের ও-ই সামলায়। তবে ওর ইংরেজি বোঝাটাও চাট্টিখানি কথা নয়। একদম খাস খানদানি ককনি।”

আমি শুধালুম, “বিয়েটা— মানে সিলেটি খালাসি আর লন্ডনি মেমেতে হল কী প্রকারে?”

“কেন হবে না? তুমি কি ভেবেছ ডোরা কোনও অক্সফোর্ড ডন-এর মেয়ে এবং কেমব্রিজের র‍্যাংলার? আর হ কথাই যদি কই, তবে বলি, সামাজিক পদমর্যাদায় আম্বর মিয়া তার মাদামের চেয়ে ঢের ঢের সরেস। মিয়া চাষির ছেলে আর ডোরা মুচির মেয়ে। অবশ্য ডোরার মতো লক্ষ্মী মেয়ে শতকে গোটেক। আমাদের যে কী আদর করে, পরে দেখতে পাবে।”

আর এমন সময় আম্বর মিয়া সহাস্য আস্যে প্রত্যাবর্তন করে বলল, “আমাদের সুখদুঃখের কথাতে মাঝে মাঝে বাধা পড়বে, স্যার। ডোরাই খদ্দেরদের কাছ থেকে হিসেবের কড়ি তোলে। এখন রাঁধছে। ওটা আমাকে সামলাতে হবে।”

আমি ভয় পেয়ে মনে মনে বললুম, ‘মেমের হাতের রান্নায় আবার সেই লাঞ্ছনা আবার সেই সাফার! আমরা তো গাঁটের রোক্কা সিক্কা ঝেড়ে হেথায় পৌঁছলুম, আর ওই হতভাগ্য লন্ডনি লাঞ্ছনা-সাফার কোত্থেকে বাস-ভাড়া জোগাড় করে আমাদের পিছনে ধাওয়া করল?’ প্রকাশ্যে বললুম, “রোস্টোমোস্টো রাঁধবে নাকি?”

হেসে বলল, “তা-ও কি কখনও হয়, স্যার। রাঁধবে খাঁটি সিলেটি রান্না।”

“শিখল কার কাছ থেকে?”

“আমার কাছ থেকে সামান্যই, কিন্তু আমার গাহক খালাসি-ভাইদের ভিতর প্রায়ই বাঢ়িয়া বাঢ়িয়া বাবুর্চি থাকেন। তাঁদের কাছ থেকে সিলেটের পোশাকি খানা থেকে মামুলি ঝোল-ভাত সবকিছু শিখে নিয়েছে।”

এমন সময় কোণের গোরা রান্নাঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে সামান্য গলা চড়িয়ে বলল, “ও মিসেস উল্লা, আজকের কারিটাতে একদম ঝাল নেই। দুটো গ্রিন চিলি— সরি— সে তো এই গড ড্যাম দেশে নেই। তা হলে একটু টাবাস্কো চিলি সস দাও না।”

বলে কী ব্যাটা! ডোরা যখন রাইস-কারি নিয়ে যাচ্ছিল, তখন সে-কারির কটকটে লাল রঙ দেখে আঁতকে উঠে আমার মতো খাস সিলেটিও মনস্থির করেছিল ওই বস্তু কম মেকদারে খেতে হবে— চাটনির মতো, ‘আ লা চাটনি’। আর এ-গোরা হট, হট, ডবল হট মাদ্রাজি আচার দিয়ে তার ঝোলের ঝাল বাড়াল।… একে একে, দুয়ে তিনে সব খদ্দের কড়ি গুনে চলে গেল। আমার চোখে একটুখানি ধাঁধার ভাব দেখে বলল, “ঠিক ধরেছেন, স্যার। সক্কলের জেবে কি আর রেস্ত থাকে? ইনশাল্লাহ, দিয়ে দেবে কোনও

« <
/ 10
> »