“আল্লাহর কসম, এই, এই মাছটাই তোকে কিনতে হবে।” তখন মাছ চড়ল নিলামে। দশ, বিশ, শ, দুশো চড়চড় করে চড়ে গেল। কবিগুরুর ভাষা একটু বদলালে দাঁড়ায়—
“দশ মাষা দিব আমি” কহিলা লন্ডন-ধামী, “বিশ মাষা” অন্য জনে কয়। দোঁহে কহে “দেহো দেহো”, হার নাহি মানে কেহ— মূল্য বেড়ে ওঠে ক্রমাগত।
আমার বোনটি অতিরঞ্জনে অভ্যস্ত নয়। শেষটায় বলল, আখেরে মাছটা বিক্রি হল এক হাজার এক টাকা মূল্যে। কিনল প্রথম লন্ডনি। এবং আশ্চর্য নগদ টাকা তার ওয়ালেটের পকেট থেকেই বের করল। তার পর বিজয়ী মাছটাকে নিয়ে প্রসেসন করে গ্রামে এসে আপন গাঁ প্রদক্ষিণ করল। বিস্তর জিন্দাবাদ জিকিরের পর মাছটাকে ব্লেড দিয়ে প্রায় ডাকটিকিটের সাইজে টুকরো টুকরো করে গাঁয়ের সব্বাইকে বিলোল। এখন এরা হাটে গিয়ে দেমাক করে, “আজার টেকি (হাজার টাকা দামের) মাছ খাই আমরা।”
can এহ বাহ্য। সমাজবিদের কান খাড়া হবে শেষ তত্ত্ব এবং তথ্যটি শুনে। লন্ডনি যত টাকা নিয়েই গ্রামে ফিরুক না কেন, জমিদার মিরাশদারের (যদ্যপি এখন আর জমিদারি নেই) বৈঠকখানায় শব্দার্থে এখনও তারা কলকে পায় না। অথচ তারা জাতে উঠতে চায়। তাই তারা হন্যে হয়ে উঠেছে সদরে, মহকুমা টাউনে বাড়ি কিনতে। সেখানে কে কার খোঁজ নেয়? এক বা দু-পুরুষে সবাই ভুলে যাবে তাদের উৎপত্তি, পেশা, জন্মস্থল। ফলে সিলেট শহরে যে-বাড়ির দাম পাঁচ বছর আগে ছিল পঞ্চাশ হাজার টাকা, এখন লন্ডনি দেড় লাখ হাঁকছে। একাধিক পেনশনার ভাবছেন সিলেটের বাড়ি বিক্রি করে ওই টাকা দিয়ে ঢাকাতে ওইরকম বাড়িই যখন পাব (সিলেট জেলার বাইরে লন্ডনি বাড়ি চায় না) তখন ছেলে-নাতির পড়াশুনোর সুবিধার জন্য ক্যাপিটালে বাস করার আরও সুবিধে সেখানেই যাই না কেন? যিনি আমাকে এ-ব্যাপারটির কথা বললেন, তিনি প্রাগুক্ত ওই মছলি-কাহিনিও জানতেন। শেষ করলেন এই বলে— আগে প্রবাদ ছিল ‘মাছ খাবি তো ইলিশ, লাং ধরবি তো পুলিশ’, এখন হয়েছে ‘মাছ খাবি ন-মণি, লাং ধরবি লন্ডনি’। কিন্তু এটা চালু হবে না। লন্ডনিরা সচ্চরিত্র।
০৪.
এই পর্যায়ের কীর্তনকাহিনি (সাগা)-র কালি ভালো করে শুকোবার পূর্বেই দেখি হঠাৎ আমি সিলেটিদের মাঝখানে। তবে খাস সিলেটে নয়, লন্ডনে। এবং বিরাট লন্ডনের সব কটা সিলেটি রেস্তোরাঁ চষতে হলে পুরো পাক্কা ছটি মাস লাগার কথা।
প্রথম যেটিতে গেলুম, সেটা নিতান্তই যোগাযোগের ফলে। লন্ডনে যে এয়ারপোর্টে নামলুম সেখান থেকে খাস লন্ডন নিদেন ত্রিশ মাইল দূরে। তিনজন পরিচিতের ঠিকানা নোটবুকে টোকা ছিল। এক সহৃদয় ইংরেজকে সে-তিনটে দেখিয়ে শুধালুম, সবচেয়ে কাছে পড়ে কোনটা। এক ঝলক দৃষ্টি হেনেই বলল, “গঙ্গা রেস্তোরাঁ।” তাই সই।
