এমনকি গঠনতন্ত্রেই লেখা আছে, কুরআন ও সহিহ হাদিসে নির্দেশিত ঈমান ও আকিদাই জামায়াতে ইসলামীর আকিদা [1] এ সবকিছুর পরও তিক্ত বাস্তবতা এটাই, জামায়াতের বিরোধীরা
জামায়াতের সমালোচনায় খুব কমই ইনসাফ করে থাকে; যদিও জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বরাবরই বিরোধীদের সমালোচনায়ও ইনসাফ রক্ষা করার এবং আলিমদের সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে থাকে।
মাওলানা মওদূদীকে নিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের সমালোচনা প্রচলিত রয়েছে। আমাদের পর্যবেক্ষণে, এসব সমালোচনার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নির্ভরযোগ্য দলিল-প্রমাণের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মতপার্থক্যর পরিবেশে অনেক সময় এমন কিছু বক্তব্যও প্রচারিত হয়, যেগুলোর সত্যতা পর্যাপ্তভাবে যাচাই করা হয় না। সময়ের পরিক্রমায় সেসব বক্তব্য বারবার পুনরাবৃত্ত হতে হতে অনেকের কাছে প্রতিষ্ঠিত সত্যে পরিণত হয়। অন্যদিকে এসব বিষয়ে পুনর্মূল্যায়ন বা সমালোচনামূলক আলোচনা করার প্রবণতাও তুলনামূলকভাবে সীমিত। অনেকের মধ্যে এমন একটি মানসিকতা কাজ করে যে, প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের কোনো বক্তব্য বা অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুললে তা অসম্মান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবেই ‘খাতায়ে বুজুর্গান গেরেফতান খাতান্ত’ (বড়োদের ভুল ধরাও নাকি ভুল) প্রবাদটি প্রায়ই উদ্ধৃত হতে দেখা যায়।
মাওলানা মওদূদীকে ঘিরে প্রচলিত অনেক অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে পুনরাবৃত্ত হয়ে আসছে। ফলে অনেকে সেগুলোকে যাচাইয়ের প্রয়োজন মনে না করেই প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করেন। এমনকি অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ণয়ের জন্য তাঁর মূল রচনাগুলো পাঠ করার ক্ষেত্রেও অনেকের মধ্যে অনীহা দেখা যায়। এর ফলে প্রত্যক্ষ পাঠ ও প্রাথমিক সূত্রের পরিবর্তে প্রচলিত ধারণাই অনেক সময় মতামত গঠনের প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে।
আমাদের এই বইয়ের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে আক্রমণ করা নয়; বরং প্রচলিত অভিযোগ ও বিতর্কগুলোকে মূল দলিল, প্রামাণ্য উদ্ধৃতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যের আলোকে পুনর্বিবেচনা করা।
ওপরে যে তিক্ত বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, এর সমর্থনে অন্তত একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা প্রয়োজন। অন্যথায় পাঠকের কাছে তা কেবল একতরফা দাবি
বলেই প্রতীয়মান হতে পারে। আমাদের চেষ্টা থাকবে, মতভেদ থাকলেও তথ্য উপস্থাপনায় ন্যায়নিষ্ঠ থাকা এবং যাচাইযোগ্য সূত্রের ওপর নির্ভর করা।
বর্তমান বাংলাদেশে কওমি অঙ্গনের একটি প্রভাবশালী সংগঠন হিসেবে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম পরিচিত। অনেকেই তাদের দেওবন্দি ধারার অন্যতম প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করেন। হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বেও তাদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন আদর্শিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের বিষয়ে তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে সমালোচনামূলক অবস্থান গ্রহণ করে আসছে। বিশেষ করে সিলেট বিভাগের কিছু অঞ্চলে কওমি মাদরাসাকেন্দ্রিক পরিমণ্ডলে এই ধারার বাইরে অন্য কোনো ইসলামী রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের প্রতি অনুকূল মনোভাব সব সময় দেখা যায় না। অতীতেও বিভিন্ন ইসলামী ব্যক্তিত্ব ও সংগঠনকে ঘিরে তীব্র মতপার্থক্য এবং কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার উল্লেখ বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যায়। যেমন : হাফেজ্জি হুজুর রহ.-এর বিরুদ্ধে শিয়া-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ, প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমান রহ.-এর গাড়িতে হামলার ঘটনা এবং খেলাফত মজলিসের সংসদ সদস্য শায়খুল হাদিস ওবায়দুল হক উজিরপুরি রহ.-এর এক সভায় অপ্রীতিকর আচরণেরও অভিযোগ হয়েছে।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের বর্তমান সভাপতি শায়খুল হাদিস মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক। তাঁর সংকলিত একটি পুস্তিকার নাম মওদূদীবাদ। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৩ সালের অক্টোবর মাসে চার দলীয় জোট সরকারের আমলে। পরবর্তী সময়ে ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়।
বর্ষীয়ান আলিম, একাধিক ভাষায় বহু গ্রন্থের প্রণেতা এবং কওমি অঙ্গনের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠনের শীর্ষ নেতা হিসেবে তাঁর বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়। উক্ত পুস্তিকায় তিনি মাওলানা মওদূদীর চিন্তা ও রচনার বিরুদ্ধে মোট ৩৮টি অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব অভিযোগ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের পাঠ্যতালিকাভুক্ত গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই তিনি জামায়াতে ইসলামীর আদর্শিক অবস্থান সম্পর্কে কঠোর সমালোচনামূলক মূল্যায়ন উপস্থাপন করেছেন। [2]
অথচ নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকেও কেউ মাওলানা মওদূদীর রচনাবলি পাঠ করলে এসব অভিযোগের বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া দুরূহ ব্যাপার। আমরা স্রেফ উদাহরণ হিসেবে তার উত্থাপিত অভিযোগগুলো হুবহু তুলে ধরেছি। বাকিটা বিবেচনা করা পাঠকের দায়িত্ব।
১. ‘দ্বীন’ অর্থ ‘স্টেট’
২. ইসলাম কোনো ধর্মের নাম নয়
৩. বর্তমান পৃথিবীর সব মুসলমান বেদীন-কাফির
৪. অন্য কোনো সরকারের অধীনে ইসলামের কোনো অস্তিত্ব থাকে না
৫. ইসলামী রাষ্ট্র ছাড়া নামাজ-রোজায় অভ্যস্ত হলেও বেঈমান
৬. নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ইবাদত নয়
৭. জিকির ও তিলাওয়াত ইবাদত নয়
৮. নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ট্রেনিং কোর্স
৯. আসলে ইবাদতের নির্দিষ্ট কোনো রূপ নেই
১০. সরকারি আইন মেনে চলাই ইবাদত
১১. রাষ্ট্রের আইনই শরিয়ত
১২. বর্তমান অবস্থায় ইবাদত নিষ্ফল
১৩. ইসলামী সরকার ছাড়া কোনো ফরজ ফরজের মর্যাদা পায় না
১৪. প্রথম শতাব্দীর পর কুরআন শরিফের অর্থ বিকৃত হয়ে গেছে
১৫. দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে কুরআন শরিফ অর্থহীন হয়ে পড়েছে
১৬. কুরআন বোঝার জন্য কোনো তাফসিরের প্রয়োজন নেই
১৭. তাফহীমুল কুরআন তাফসির নয়, আমার নিজস্ব উপলব্ধি
১৮. যে ফিকহের কিতাবাদি অনুসরণ করবে, সে জাহান্নামি। তার নাজাতের আশা নেই
১৯. পূর্বকার রচিত কিতাবাদি বর্তমানে কোনো কাজের নয়
২০. হাদিস অস্বীকার
২১. হাদিস, তাফসির ও ফিকহের কিতাবাদি গ্রহণযোগ্য নয়
২২. মসজিদ, মাদরাসা, খানকাতে ইসলাম নেই
২৩. উলামাদের সঠিক ফতোয়া প্রদানের যোগ্যতা নেই
২৪. পির, আউলিয়া ও মুজতাহিদীনদের অনুসরণ হারাম
২৫. আইম্মায়ে মুজতাহিদিন পাগল ও বিদেশি ছিলেন
২৬. মুহাদ্দিস ও ফকিহগণের ন্যায়শাস্ত্রের যোগ্যতা ছিল না
২৭. চার ইমামের অনুসারীরা পশুর সমান
২৮. আমি কোনো মাজহাব মানি না
২৯. সব ব্যর্থতার মূল, বুজুর্গানেদ্বীনের অনুসরণ
৩০. সত্যিকারে মুসলমান কেউই নেই
৩১. মুসলমানদের শতকরা ৯৯ ভাগ বেদীন
৩২. কোনো নবিই নিষ্পাপ ছিলেন না; সবাই কিছু না কিছু পাপে লিপ্ত ছিলেন
৩৩. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দায়িত্ব আদায়ে ভুলত্রুটি করেছেন
৩৪. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মতো দাড়ি রাখা বিদআত
৩৫. তিন নবি ছাড়া কোনো নবিই তাঁদের চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেননি
৩৬. হযরত উসমান ও আলি রা.-এর খিলাফতে জাহেলিয়াতের ঢল নেমেছিল
৩৭. মুজাদ্দিদে আলফে সানি ও শাহ ওয়ালিউল্লাহ মানুষকে হিদায়াত করতে গিয়ে গোমরাহ করেছেন
৩৮. প্রচলিত তাসাউফ পরিত্যাজ্য।
তাদের দৃষ্টিতে এ জাতীয় উদ্ভাবিত বিভিন্ন অভিযোগের নামই ‘মওদূদীবাদ’। তবে আমাদের বিবেচনায় এসব অভিযোগের উল্লেখযোগ্য অংশ তথ্যগতভাবে দুর্বল এবং অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আমাদের প্রশ্ন হলো, কোনো ব্যক্তি বা চিন্তাধারা সমালোচনা করতে হলে যাচাইযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতেই তা করা অধিকতর গ্রহণযোগ্য নয় কি? মতপার্থক্য থাকতেই পারে; কিন্তু তা যদি দলিল-প্রমাণ ও বাস্তব তথ্যের আলোকে উপস্থাপিত হয়, তাহলে আলোচনাটি আরও ফলপ্রসূ হয়।
জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য ইসলামী ধারার মধ্যে দীর্ঘদিনের আদর্শিক ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে। সেই মতপার্থক্য প্রভাব অনেক সময় পারস্পরিক মূল্যায়নেও প্রতিফলিত হয়েছে। তবে আমাদের বিশ্বাস, মতভেদ থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন সম্পর্কে যাচাইবিহীন তথ্য প্রচার করা সঠিক পন্থা নয়। এতে কেবল বিভ্রান্তিই বাড়ে, সত্য অনুসন্ধানের পথ সহজ হয় না।
এ ধরনের তথ্যগত অসংগতির আরও বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে, যেগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করতে হলে স্বতন্ত্র একটি গ্রন্থ প্রয়োজন হবে। ইসলামের শিক্ষা হলো,
প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রেও অপবাদ ও অসত্য তথ্য প্রচার বৈধ নয়। তাই কোনো মুসলিম ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে অভিযোগ উত্থাপনের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ সতর্কতা, ন্যায়পরায়ণতা ও সত্যনিষ্ঠা অপরিহার্য। আমরাও ছোটবেলা থেকে প্রচলিত নানা বক্তব্য শুনে বড়ো হয়েছি। পরে মাওলানা মওদূদীর মূল রচনাগুলো পাঠ ও যাচাই করার পর উপলব্ধি করেছি, প্রচলিত ধারণা ও মূল লেখার মধ্যে সব ক্ষেত্রে মিল পাওয়া যায় না।
আমরা আগেও বলেছি, এখনও বলছি, ভবিষ্যতেও বলব, কোনো ভুল থাকলে তা ভুলই। গঠনমূলক সমালোচনা কখনো জ্ঞানের পরিপন্থী নয়; বরং তা চিন্তার বিকাশে সহায়ক। এ কারণেই মাওলানা মওদূদীর জীবদ্দশায় সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নদভি রহ. তাঁর চিন্তার কিছু বিষয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে গ্রন্থ রচনা করলে মাওলানা মওদূদী কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতেও এমন সমালোচনা অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানান।
তিনি স্পষ্টভাবে লিখেছিলেন, গঠনমূলক সমালোচনা থেকে তিনি উপকৃত হবেন। প্রতিটি বিষয়ে একমত হওয়া সম্ভব না হলেও এ ধরনের আলোচনা জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে এবং চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। একইভাবে তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংগঠন জামায়াতে ইসলামীও দীর্ঘদিন ধরে ‘ইহতিসাব’-এর মাধ্যমে পারস্পরিক আত্মসমালোচনা ও ভুল সংশোধনের একটি সাংগঠনিক সংস্কৃতি অনুসরণ করে আসছে। তাই তাঁর চিন্তা ও বক্তব্য মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও আমরা আশা করি, আলোচনা হবে দলিল, প্রেক্ষাপট ও পূর্ণাঙ্গ উদ্ধৃতির ভিত্তিতে।
জামায়াতে ইসলামীর আকিদা সম্পর্কে জানতে হলে সংগঠনের গঠনতন্ত্রের ২ নম্বর ধারা দেখা যেতে পারে। আর এই বইয়ে আমরা মূলত পর্যালোচনা করব, মৌলিক আকিদাসংক্রান্ত বিষয়ে মাওলানা মওদূদী তাঁর নিজস্ব রচনায় কী লিখে গেছেন। এখানে বিচ্ছিন্ন বা খণ্ডিত উদ্ধৃতির ওপর নির্ভর করা হয়নি; বরং সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধগুলো যথাসম্ভব পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যেখানে বক্তব্য সংক্ষিপ্ত বা অস্পষ্ট মনে হয়েছে, সেখানে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা সংযোজন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোও আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাতে পাঠক মূল বক্তব্য সহজে অনুধাবন করতে পারেন।
বিতর্কিত বিষয়গুলোতেও তাঁর পূর্ণাঙ্গ আলোচনার ভিত্তিতে তাঁর অবস্থান বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। একই সঙ্গে যেখানে আমাদের দৃষ্টিতে সমালোচনার অবকাশ রয়েছে, সেখানে নিরপেক্ষতার সঙ্গে তা উল্লেখ করা হয়েছে। বইটি এক খণ্ডে প্রকাশ করা সম্ভব হলেও বিষয়গুলোর গভীরতা বিবেচনায় আমরা একাধিক খণ্ডে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর কারণ পরবর্তী খণ্ডে ব্যাখ্যা করা হবে, ইনশাআল্লাহ।
সংকলকও ভুলের ঊর্ধ্বে নন। তাই এই বই আমরা শুধু সমর্থকদের জন্য নয়, সমালোচকদের জন্যও প্রস্তুত করেছি। আমাদের প্রত্যাশা, সমর্থন হোক জ্ঞান ও দলিলের ভিত্তিতে; আর সমালোচনাও হোক ন্যায়, প্রমাণ ও ইনসাফের আলোকে।
বই প্রকাশের আগেই কেউ কেউ এর সমালোচনা করার ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা তাদের প্রতিও শুভকামনা জানাই। আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা, আলোচনা যেন দলিল, যুক্তি ও গবেষণার ভিত্তিতে হয়। যে আপত্তির উত্তর বইয়ের ভেতরেই স্পষ্টভাবে রয়েছে, তা নিয়ে আলাদা বিতর্কে না যাওয়ার নীতি আমরা অনুসরণ করব। তবে কোনো গঠনমূলক সমালোচনা বা যুক্তিসংগত আপত্তি এলে আমরা তা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করব। যদি তা গ্রহণযোগ্য হয়, পরবর্তী সংস্করণে সংশোধন করা হবে। আর যদি গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে কেন তা গ্রহণ করা হলো না, সে ব্যাখ্যাও পরবর্তী খণ্ডের পরিশিষ্টে তুলে ধরা হবে।
আরেকটি বিষয় জানিয়ে রাখি, সংকলক হিসেবে আমি যে বিশ্লেষণ করেছি, পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে সেই অংশগুলো এই বইয়ের মধ্যে বক্স আকারে রাখা হয়েছে, যাতে তা মূল লেখার সাথে সংমিশ্রণ না ঘটে।
আসুন, এবার ডুব দিই পাঠের সরোবরে। আমার আন্তরিক অনুরোধ, বইটি যেন পূর্ণ মনোযোগ ও বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে পড়া হয়। সম্ভব হলে হাতে একটি পেন্সিল রাখুন। প্রয়োজনীয় অংশে দাগ টানুন, নোট নিন এবং আলোচিত দলিলগুলো নিজে মিলিয়ে দেখুন।
বইটির বিষয়বস্তু মূলত আকিদা ও তাত্ত্বিক আলোচনা। তাই কিছু অংশ প্রথম পাঠে জটিল মনে হতে পারে। যথাসাধ্য সহজভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছি। তারপরও কোথাও অস্পষ্টতা থাকলে সংশ্লিষ্ট অংশ পুনরায় পড়ার অনুরোধ রইল।
বিশেষভাবে অনুরোধ, কোনো বক্তব্যের মূল্যায়নের আগে তা পূর্ণ প্রেক্ষাপটে পড়ুন। বিচ্ছিন্ন উদ্ধৃতির পরিবর্তে সম্পূর্ণ আলোচনার ভিত্তিতেই মত গঠন করুন। আমরা বিশ্বাস করি, ধৈর্য ও মনোযোগের সঙ্গে বইটি পাঠ করলে মাওলানা মওদূদীর নিজস্ব লেখনীর আলোকে তাঁর আকিদা ও চিন্তাধারা সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে, ইনশাআল্লাহ। গুরুত্বপূর্ণ এই গ্রন্থটি প্রকাশের জন্য গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্সকে আন্তরিক মুবারকবাদ জানাচ্ছি।
আলী হাসান উসামা
জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্র থেকে
একনজরে তাওহিদ ও রিসালাতের আকিদা
কুরআন ও সহিহ হাদিসে নির্দেশিত ঈমান ও আকিদাই জামায়াতে ইসলামীর অনুসারীগণ পোষণ করিয়া থাকেন। যাহার মূল কথা হইল—
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তায়ালার রাসুল।
ব্যাখ্যা : (ক) এই ঈমান ও আকিদার প্রথমাংশ অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার একমাত্র ইলাহ হওয়া এবং আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত অন্য কাহারো ইলাহ না হওয়ার অর্থ এই যে, আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর মধ্যে যাহা কিছু আছে, সেই সবকিছুর সৃষ্টকর্তা, প্রতিপালক, মাবুদ এবং প্রাকৃতিক ও বিধিগত সার্বভৌম সত্তা হইতেছেন একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। এসবের কোনো একদিক দিয়াও কেউ তাঁহার সহিত শরিক নাই।
এই মৌলিক সত্য কথাটি জানিয়া ও মানিয়া লইলে নিম্নলিখিত বিষয়গুলি অনিবার্যরূপে গ্রহণ করিতে হয়—
এক. মানুষ আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত আর কাহাকেও নিজের পৃষ্ঠপোষক, কার্য সম্পাদনকারী, প্রয়োজন পূরণকারী, বিপদ দূরকারী, ফরিয়াদ শ্রবণ ও গ্রহণকারী এবং সাহায্যদাতা ও রক্ষাকর্তা মনে করিবে না। কেননা, তিনি ব্যতীত আর কাহারো নিকট কোনো ক্ষমতা নাই।
দুই. আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত আর কাহাকেও কল্যাণকারী মনে করিবে না, কাহারো সম্পর্কে অন্তরে ভীতি অনুভব করিবে না, কাহারো ওপর নির্ভর করিবে না, কাহারো প্রতি কোনো আশা পোষণ করিবে না এবং এই কথা বিশ্বাস করিবে না যে, আল্লাহ তায়ালার অনুমোদন ব্যতীত কাহারো ওপর কোনো বিপদ-মুসিবত আপতিত হইতে পারে। কেননা, সকল প্রকার ক্ষমতা ও ইখতিয়ার একমাত্র আল্লাহ তায়ালারই।
তিন. আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত আর কাহারো নিকট দুআ বা প্রার্থনা করিবে না, কাহারো নিকট আশ্রয় খুঁজিবে না, কাহাকেও সাহায্যের জন্য ডাকিবে না এবং
আল্লাহ তায়ালার ব্যবস্থাপনায় কাহাকেও এতখানি প্রভাবশালী বা শক্তিমান মনে করিবে না যে, তাহার সুপারিশে আল্লাহ তায়ালা ফয়সালা পরিবর্তন করিতে বাধ্য। কেননা, তাঁহার রাজ্যে সকলেই ক্ষমতাহীন প্রজামাত্র।
চার. আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত আর কাহারো সম্মুখে মাথা নত করিবে না এবং কাহারো উদ্দেশ্যে মানত মানিবে না। কেননা, এক আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত ইবাদত (দাসত্ব, আনুগত্য ও উপাসনা) পাইবার অধিকারী আর কেউ নাই।
পাঁচ. আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত অপর কাহাকেও বাদশাহ, রাজাধিরাজ ও সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক মানিয়া লইবে না, কাহাকেও নিজ স্বভাবে আদেশ ও নিষেধ করিবার অধিকারী মনে করিবে না। কেননা, স্বীয় সমগ্র রাজ্যের নিরঙ্কুশ মালিকানা ও সৃষ্টিলোকের সার্বভৌমত্বের অধিকার আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত অপর কাহারো নাই।
উপরিযুক্ত ঈমান ও আকিদা অনুযায়ী নিম্নলিখিত বিষয়গুলিও মানিয়া লওয়া আবশ্যক—
এক. মানুষ স্বীয় স্বাধীন ইচ্ছা ও আজাদি কুরবানি করিবে, নফসের ইচ্ছা-বাসনার দাসত্ব পরিত্যাগ করিবে এবং যে আল্লাহ তায়ালাকে ইলাহ মানিয়া লইয়াছে একনিষ্ঠভাবে, একমাত্র তাঁহারই বান্দা ও দাস হইয়া জীবনযাপন করিবে।
দুই. নিজেকে কোনো কিছুরই স্বাধীন ইচ্ছাসম্পন্ন মালিক মনে করিবে না; বরং স্বীয় জীবন, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, মানসিক ও দেহতান্ত্রিক শক্তি তথা সবকিছুকে আল্লাহ তায়ালার মালিকানাধীন এবং তাঁহার নিকট হইতে প্রাপ্ত আমানত মনে করিবে।
তিন. নিজেকে আল্লাহ তায়ালার নিকট দায়ী ও জবাবদিহি করিতে বাধ্য মনে করিবে, শক্তি-সামর্থ্যের ব্যবহার এবং স্বীয় আচরণ ও ক্ষমতা প্রয়োগে সব সময় সত্যের প্রতি লক্ষ রাখিবে যে, পরকালে আল্লাহ তায়ালার সম্মুখে এইসব বিষয়ের হিসাব অবশ্যই দিতে হইবে।
চার. আল্লাহ তায়ালার যাহা পছন্দ, তাহাকেই নিজের পছন্দ এবং যাহা তাঁহার অপছন্দ, তাহাকেই নিজের অপছন্দরূপে গ্রহণ করিবে।
পাঁচ. আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি এবং তাঁহার নৈকট্য লাভকেই নিজের যাবতীয় চেষ্টা সাধনার চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং নিজের সমগ্র তৎপরতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গ্রহণ করিবে।
ছয়. স্বীয় নৈতিক চরিত্র, আচার-ব্যবহার এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাজকর্ম, এককথায় জীবনের সর্ববিষয়ে কেবল আল্লাহ তায়ালার
বিধানকেই একমাত্র হিদায়াত হিসেবে মানিয়া লইবে এবং আল্লাহ তায়ালার দেওয়া শরিয়তের বিপরীত যাবতীয় নিয়মনীতি ও পথা-পদ্ধতিকে প্রত্যাখ্যান করিবে।
ব্যাখ্যা : (খ) এই ঈমান ও আকিদার দ্বিতীয় অংশ : মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তায়ালার রাসুল হইবার অর্থ এই যে, বিশ্বের একমাত্র বাদশাহ আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হইতে বিশ্বের সকল মানুষের প্রতি সর্বশেষ নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে একমাত্র নির্ভুল হিদায়াত ও আইন-বিধান প্রেরিত হইয়াছে এবং এই হিদায়াত ও আইন-বিধান অনুযায়ী কাজ করিয়া পূর্ণাঙ্গ বাস্তব নমুনা কােম করার জন্যই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিযুক্ত করা হইয়াছে।
যাহারা এই পরম সত্য ও প্রকৃত বিষয়টিকে জানিয়া ও মানিয়া লইবেন, তাহাদের কর্তব্য হইবে—
এক. মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট হইতে যেই হিদায়াত ও আইন-বিধান প্রামাণ্য সূত্রে পাওয়া যাইবে, তাহা দ্বিধাহীন ও অকুণ্ঠচিত্তে গ্রহণ করা।
দুই. কোনো কাজে উদ্যোগী হওয়া বা কোনো নিয়ম-পদ্ধতি অনুসরণ হইতে বিরত থাকিবার জন্য আল্লাহ তায়ালার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট হইতে প্রাপ্ত আদেশ ও নিষেধকেই যথেষ্ট মনে করা।
তিন. আল্লাহ তায়ালার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যতীত অপর কাহারো স্বয়ংসম্পূর্ণ নেতৃত্ব মানিয়া না লওয়া। কেননা, অন্য কাহারো আনুগত্য হইতে হইবে আল্লাহ তায়ালার কিতাব এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নতের অধীন।
চার. জীবনের সকল ব্যাপারেই আল্লাহ তায়ালার কিতাব ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নতকে অকাট্য, প্রামাণ্য, বিশ্বস্তসূত্র ও নির্ভুল জ্ঞানের একমাত্র উৎসরূপে গণ্য করা। যেসব ধারণা, খেয়াল, বিশ্বাস কিংবা নিয়মনীতি ও পন্থা কুরআন ও সুন্নাহর বিপরীত, তাহা পরিত্যাগ করা এবং কোনো সমস্যার সমাধান প্রয়োজন হইলে তাহার জন্য হিদায়াত লাভের উদ্দেশ্যে এই উৎসের দিকেই ধাবিত হওয়া।
পাঁচ. ব্যক্তিগত ও পারিবারিক, বংশীয় ও জাতিগত, দলীয় ও সম্প্রদায়গত, আঞ্চলিক ও ভাষাগত তথা সকল প্রকার হিংসা-বিদ্বেষ ও বিভেদ হইতে মন-মগজকে মুক্ত ও পবিত্র করিয়া লওয়া এবং কাহারো ভালোবাসা বা অন্ধভক্তিতে
- বইয়ের নামের সঙ্গে কারও কাছে এ বিষয়টি সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে। এর জবাব হলো, মাওলানা মওদূদী জামায়াতে ইসলামীর জন্য নতুন কোনো আকিদা প্রণয়ন করে যাননি; বরং তাঁর পড়াশোনায় কুরআন ও সুন্নাহ থেকে যেসব আকিদা তিনি আহরণ করেছেন, সেগুলোই তথ্য-উপাত্তের সঙ্গে লিখে গেছেন। প্রণেতা ও প্রচারক সম্পূর্ণ ভিন্ন। আকিদার প্রণেতা স্বয়ং আল্লাহ ও তাঁর রাসুল। ব্যক্তিজীবনে মাওলানা মওদূদী সাধারণত হানাফি ধারা অনুসরণ করতেন। এ কারণে আকিদার ক্ষেত্রেও তাঁর অনেক মতামতের সঙ্গেই ইমাম আবু হানিফা রহ. প্রণীত আল ফিকহুল আকবার এবং ইমাম তহাবি রহ. রচিত আকিদা তহাবি-এর মিল পাবেন। যদিও এমন জুলুমও হয়েছে, একই বক্তব্য ইমাম আবু হানিফা দেওয়ায় কেউই তাঁর সমালোচনা করেনি, অথচ হুবহু সেই কথাটাই লেখার কারণে মাওলানা মওদূদীকে ‘নবিবিদ্বেষী’ ট্যাগ খেতে হয়েছে। এ বইয়ের ‘ইসমতে আম্বিয়া’ অধ্যায়ে এর যথাযথ দৃষ্টান্ত পেয়ে যাবেন। এমনকি এ ধরনের উদাহরণ তো রয়েছে ভুরিভুরি, একই তাফসির প্রাচীন গ্রন্থাবলিতে থাকা সত্ত্বেও তা পাঠ করা হয় অত্যন্ত আদবের সাথে, কিন্তু মাওলানা মওদূদী উল্লেখ করার কারণে তার রচনা ছুড়ে ফেলা হয় আস্তাকুঁড়ে। ↩
- পুস্তিকাটির সফট কপি গুগলে সার্চ করলেই পাওয়া যাবে। আর্কাইভ ডট ওআরজি থেকে ডাউনলোড করে মিলিয়ে নিতে পারেন। ↩
