এরূপ সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার নেতৃত্ব দেবে সর্বহারারা শ্রমিকগণ। এভাবে রাষ্ট্র সর্বহারার একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে।
বাম সংশ্লিষ্ট শব্দ ও পরিভাষা
সমাজতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রী, কমিউনিজম ও কমিউনিস্ট, সাম্যবাদ ও সাম্যবাদী, বুর্জোয়া-সর্বহারার শ্রেণি-সংগ্রাম ও শ্রেণি-সংগ্রামী প্রভৃতি পরিভাষাসমূহ মূলত বামপন্থি মহলে একান্ত নিজস্ব পরিমণ্ডলে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এগুলো সামরিকভাবে প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য এই তত্ত্বের প্রায় পুরোটা ইতিহাসজুড়ে সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসবাদ, উগ্রপন্থা ও চরমপন্থি ইত্যাদি প্রক্রিয়া কার্যকর ছিল। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সাধারণভাবে প্রচলিত উদার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে এই মতবাদের প্রতিষ্ঠা কার্যত অসম্ভব। ফলে নিজেদের সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘শ্রেণি-সংগ্রামী’ ও ‘বুর্জোয়া’ বাছাই করে সন্ত্রাসবাদ, উগ্রপন্থা, চরমপন্থি প্রভৃতি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এদের ‘নিষ্পেষণ’ করা এখানে জরুরি হয়ে পড়ে। এ পর্যায়ে বামপন্থি ব্যবহৃত শব্দ ও পরিভাষাগুলো সংক্ষেপে পরিচিতি উল্লেখ করা হলো, যাতে মূল আলোচনার মধ্যে ব্যবহৃত শব্দ সম্পর্কে পাঠকের সহজ উপলব্ধি ঘটতে পারে।
সাম্যবাদ
সাম্যবাদ সমাজতন্ত্রেরই উচ্চতর একটি পর্যায়। সমাজতন্ত্রের সঙ্গে সাম্যবাদের পার্থক্য প্রকট নয়, বরং মাত্রাপাত। সমাজতান্ত্রিক পর্যায়ে যৌথ খামার এবং সমবায়ী মালিকানা উভয়ের অন্তর্ভুক্ত থাকে, কিন্তু সাম্যবাদী পর্যায়ে থাকে একধরনের ব্যবস্থা—রাষ্ট্র বা সমষ্টিতে জনগণের মালিকানা। সমাজতান্ত্রিক পর্যায়ে বিশেষ করে যৌথ খামারের ক্ষেত্রে মেধার ভিত্তিতে প্রভেদের অন্তর্ভুক্ত থাকে, কিন্তু সাম্যবাদী পর্যায়ে তা সম্পূর্ণ লোপ পায়। সাম্যবাদী সমাজে উৎপাদন ও বণ্টন মূলকভাবে হবে—’প্রত্যেক তার সাধ্য অনুযায়ী দান করবে এবং প্রত্যেক তার প্রয়োজন অনুযায়ী জীবনধারণের উপকরণ পাবে।’ সাম্যবাদী সমাজে অর্থনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উপরিকাঠামোর পরিবর্তন ঘটে। সাম্যবাদী বিকাশের পর্যায়ে রাজনৈতিক ও আইনগত প্রতিষ্ঠানসমূহের অবলুপ্তি ঘটে। সমগ্র জনগণ সাম্যবাদী জীবনপদ্ধতির কতগুলো সাধারণ ও সর্বজনগ্রাহ্য নিয়ম মেনে চলে।[1]
সর্বহারা
সমাজতন্ত্রীদের দৃষ্টিতে, যেসব মানুষের নিজেদের কোনো জমি কিংবা উৎপাদনের উপকরণ নেই, যারা বেঁচে থাকার জন্য সারাজীবন মজুরির বিনিময়ে অন্যের সম্পত্তিতে কাজ করে, তারাই হলো সর্বহারা শ্রেণি। মার্ক্সীয় দৃষ্টিতে মজুরির আয়ে জীবন কাটানো এই শ্রেণির মানুষের অর্থনৈতিক উৎপাদনব্যবস্থায় সাম্য বলে কিছু থাকে না। সর্বহারা মূলত শ্রম বিক্রয়ের ওপর নির্ভরশীল। আর শ্রম যেহেতু কায়িক ব্যাপার, ফলে সর্বহারা শ্রেণি এখানে বুর্জোয়া শ্রেণি দ্বারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শোষিত হয়। বুর্জোয়াশক্তির বিরুদ্ধে শ্রেণিগ্রাম সমাজতন্ত্রী বিপ্লবের সর্বাপেক্ষা বড়ো চালিকাশক্তি। কৃষক ও অন্যান্য শোষিত শ্রেণিকে এই সংগ্রামে সর্বহারা শ্রেণি
- হারুনুর রশীদ : রাজনীতিকোষ, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা; জুলাই, ২০১৩। ↩
