রেফারেন্স বইপত্র হাতের কাছে থাকলে তিনি বইটিকে একটি তথ্যসমৃদ্ধ বইয়ে রূপান্তর করতে পারতেন। তিনি পুরো বইটিই লিখেছেন স্মৃতির ওপর নির্ভর করে। তবে তার এ লেখাটি পড়ে যারপরনাই বিস্মিতই হতে হয়, তার স্মৃতিশক্তির প্রখরতা দেখে। তিনি ইতিহাসের সন-তারিখ, সংবিধানের বিভিন্ন ধারা-উপধারা, বিভিন্ন বইয়ের নানা অংশের মূলভাব ও লেখকের নাম এত চমৎকার ও নিখুঁতভাবে এনেছেন, যেন তার মানসপটে সেই ঘটনাবলি পুনরায় সবাক ও সচিত্র হয়ে উঠেছিল।
পাশাপাশি রেফারেন্সসমৃদ্ধ বই না হওয়ার কারণে আমাদের জন্য একধরনের উপকারও হয়েছে বটে, বইটি তথ্যের ভারে নীরস হয়ে ওঠেনি; বরং ঝরঝরে গদ্যের একটি অকৃত্রিম সুখপাঠ্য বই হয়ে উঠেছে। তথ্যসমৃদ্ধ বই হলে হয়তো এই সুখপাঠ্যতার বৈশিষ্ট্য থেকে বইটি বঞ্চিতই হতো। ফলে এটি একজন গবেষকের গবেষণাপ্রবন্ধ ধরনের রচনা হয়ে না উঠে একজন রাজনীতিবিদের আলাপি বয়ান হয়ে উঠেছে, যে আলাপ শীতের রোদে পিঠ লাগিয়ে ধূমায়িত চা পান করতে করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাগ্রহে শোনা যায়।
পাঁচ.
ফাঁসির সেল থেকে দেখা বাংলাদেশ রাজনীতিবিদ ও লেখক কামারুজ্জামানের আরও কিছু স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য ও চিন্তাধারা আমাদের সামনে পষ্ট করে তোলে। সেগুলোর অন্যতম হচ্ছে, গুণের কদর ও দোষের সমালোচনার অকৃত্রিম হিম্মত ছিল তার। তিনি এ বইয়ে তার রাজনৈতিক ও আদর্শিক শত্রুদের সগুণাবলিরও স্বীকৃতি দিয়েছেন আবার নিজের কিংবা নিজের দলের ভুল ও দুর্বলতাও অকপটে স্বীকার করেছেন। সামনের পথ নির্ধারণে অতীত পর্যালোচনায় জোর দিয়েছেন।
আরেকটি দিক আমরা দেখতে পাই তার চরিত্রে। আর তা হলো, ইসলামী আন্দোলনের প্রতি সুদৃঢ় কমিটমেন্ট। সংগঠনের অভ্যন্তরে তার বেশ কিছু নিজস্ব আকাঙ্ক্ষা ছিল যে, বিষয়গুলো এভাবে হোক। কখনও তার মত গ্রহণীয় হয়েছে, আবার কখনও-বা অগ্রহণীয় হয়েছে। কিন্তু তার দ্বিমতের জায়গাগুলোতেও তিনি সামগ্রিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সবসময় তৎপর ছিলেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কর্তৃক একেবারে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের প্রারম্ভিকায় প্রলুব্ধকর প্রস্তাব পেয়েও তিনি তা এড়িয়েছেন আদর্শিক দায়বদ্ধতা ও দরদের জায়গা থেকে।
ছয়.
ঠিক আত্মজীবনী না হলেও ফাঁসির সেল থেকে দেখা বাংলাদেশ আত্মজীবনীর যে রস, রূপ, গন্ধ; তার কিছু কিছু আমাদের পাইয়ে দেয়। আবার আত্মজীবনীর যে আত্মবয়ান কিংবা বারবার ‘আমি’ শব্দ উচ্চারণের শ্রুতিকটুতা, তা থেকেও বইটি অনেকাংশে মুক্ত। সবমিলিয়ে এটি একাধারে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির ইতিহাস পাঠ, রাজনৈতিক বিশ্লেষণাত্মক গ্রন্থ ও আত্মজীবনীমূলক বইয়ের স্বাদ পাইয়ে দেবে পাঠককে।
