অনুবাদকর্মের সৃষ্টিশীল উদাহরণ। তার এই কর্মটি নিছক ভাষান্তর না হয়ে একটি নতুন সৃষ্টি হয়ে উঠেছে। এ ছাড়াও সাপ্তাহিক সোনার বাংলা-র সম্পাদকীয় এবং বিশ্লেষণাত্মক লেখাগুলো একজন প্রাজ্ঞ সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মর্যাদাও তার জন্য অপরিহার্য করে তোলে।
তিন.
ফাঁসির সেল থেকে দেখা বাংলাদেশ কামারুজ্জামানের শেষ রচনা। কারাপ্রকোষ্ঠের নিঃসঙ্গ ও নিরানন্দ সময়গুলোতে তিনি এমন একটি দীর্ঘ লেখার প্রেরণা ও মানসিক স্থিরতা কীভাবে পেলেন, তা বিস্ময়করই বটে। লেখাটি শুরু হয়েছে পলাশির যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের মাধ্যমে বাংলা অঞ্চলের পরাধীনতার সূচনাকালের বিবরণ দিয়ে। তারপর তিনি সংক্ষেপে ধারাবাহিকভাবে বিবরণী টেনেছেন ব্রিটিশ শাসনামলে মুসলমানদের স্বাধিকার আন্দোলনগুলোর। এরপর ব্রিটিশ শাসনামলের শেষদিক থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত মোটামুটি কোথাও সংক্ষিপ্ত কোথাও বিস্তৃতভাবে জাতীয় রাজনীতির একটি স্কেচ এঁকেছেন।
বইটির সবচেয়ে প্রাণবন্ত অংশের বর্ণনা শুরু হয়েছে একাত্তর-পরবর্তী সময় থেকে। কেননা, এর আগপর্যন্ত যে বয়ান তিনি দিয়ে আসছিলেন, সেখানে প্রতিফলিত হয়েছে নিছক একজন ইতিহাসপাঠকের পাঠের নির্যাস। কিন্তু একাত্তর-পরবর্তী সময় থেকে যে বর্ণনা শুরু হয়েছে, সেখানে লেখক কেবল একজন পাঠক বা গবেষক নন; বরং তিনি নিজেই সেই ইতিহাসের প্রত্যক্ষদর্শী এবং নিজেই একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারও বটে। একজন মেধাবী ছাত্রনেতা থেকে একজন প্রাজ্ঞ জাতীয় নেতার বিবরণীতে আমরা সত্তর, আশি, নব্বইয়ের দশক এবং এ শতাব্দীর শূন্য দশকের বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির বয়ান শুনতে পাই। এমন অনেক ঘটনার নেপথ্য বিষয়াদি এ অংশে আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়, আমরা এতদিন নিছক যার বাইরের আবরণ সম্পর্কে জানতাম। উল্লিখিত চার দশকের জাতীয় রাজনীতি ও জামায়াতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি সামগ্রিক ধারণা আমরা এখানে পেয়ে যাই, যা ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য দলিল ও প্রাইমারি সোর্স হওয়ার উপযুক্ত।
চার.
মুহাম্মদ কামারুজ্জামান বইটি লিখেছেন তার বড়ো ছেলে ওয়ামীর উদ্দেশ্যে লেখা চিঠির আদলে। ‘প্রিয় ওয়ামী’ বলে সম্বোধন করে তিনি লেখার প্রতিটি পর্ব শুরু করেছেন এবং শেষ করেছেন রচনার সময় ও তারিখ উল্লেখ করে।
সম্ভবত কারাবিধির বাধ্যবাধকতার কারণে তিনি এভাবে চিঠিরূপে লিখেছেন। সংগত কারণেই সম্বোধনের এ অংশগুলো সম্পাদনাকালে বাদ দেওয়া হয়েছে, তবে কিছু কিছু পর্বে এ সম্বোধনটা বিভিন্ন কারণে প্রাসঙ্গিক ছিল, তাই কয়েকটি পর্বে সেই সম্বোধন অংশটা রেখে দেওয়া হয়েছে।
কামারুজ্জামান এ সম্বোধন অংশে বারবার আক্ষেপ করেছেন তার হাতের কাছে রেফারেন্স বইপত্র না থাকার। তিনি লিখেছেন,
