যে আপনি-আমি লন্ডন-নটিংহামের যে কোনও দ্বিতীয় শ্রেণির ইংরেজি রেস্তোরাঁতেও পাটনা রাইস এবং কারি পাচ্ছি তার গোড়াপত্তন হয় ওই সময় (পাটনা রাইস বলে বটে, কিন্তু সেটা দেরাদুন, বাসমতি সবকিছুই হতে পারে। বহু গবেষণা করে সন্ধান পেলুম কোম্পানির আমলে এ-দেশ থেকে যে-চাল বিলেত যেত সেটা প্রধানত সংগ্রহ করা হত পাটনার আড়তে যে-হরেক প্রদেশের চাল জড়ো হয়েছে তার থেকে; তাই এর অমনিবাস নাম হয়ে যায় পাটনা রাইস) সৈন্যদের এবং লন্ডনিদের ক্ষুধা নিবারণের জন্য।
আজ এদেশ থেকে প্রতিদিন মণ মণ চাল, ডাল, শুঁটকি, মসলা ইত্যাদি তো যাচ্ছেই, তার ওপর হাজার হাজার বোতল আম, লেবু, জলপাইয়ের আচার। গত বছর সিলেটে এক বিরাট আচার ফ্যাক্টরি দেখে আমি স্তম্ভিত। পরে সে কারখানার অমায়িক মালিকের সঙ্গে দেখা হলে তিনি বললেন, “যা তৈরি হয় তার প্রায় বেবাক মাল চলে যায় লন্ডনিদের খেদমতে। চাহিদাও বেড়ে চলেছে। আমি পেরে উঠছি না।” অবশ্য আমি জানতুম, মালদার ম্যাংগো স্লাইস এবং মিষ্টি-টক (সুইট-সাওয়ার) আমের আচারের এক বৃহৎ অংশ লন্ডনিদের তরেই যায়। কারণ সিলেটের আম জঘন্য। তার থেকে ভালো আচার হয় না— স্লাইস মাথায় থাকুন। অবশ্য সিলেট থেকে সর্বোকৃষ্ট আনারস-স্লাইস বিলেত যায়। মার্কিন হাইনস ‘ফিফটি সেভেন’-এর (বা অন্য সংখ্যাও হতে পারে) মতো সিলেটি আচার কারখানা ৪৭ রকমের আচার, স্লাইস ইত্যাদি তৈরি করে। বুঝুন, যে সিলেটি দেশে ভাত, লাল লঙ্কা পেষা, আর কিস্যুৎ— নিতান্তই মেহেরবান হলে একটি কাঁচা পেঁয়াজ খেত— তা-ও দুবেলা নয় এবং সে-ও পেট ভরে নয়— সে কি না আজ সিলেটের জমিদার-ছেলেরও যা জোটে না বিলেতে বসে তাই খায়। এস্তেক পান-তক। পান যায় প্লেনে। তাই নাকি একটা খিলির দাম সিক্স পেন্স থেকে এক শিলিং!
সিলেটিরা বিলেতে চাকরি পায় কেন? কাগজে নিশ্চয়ই পড়েছেন, সাদা আর কালো মজুরে সেখানে নিত্য লড়াই। আমি এ-বিষয়ে সরেজমিন তদন্ত-তাবাশ করিনি। যা শুনেছি, তাই বলছি: ১. কালোরা— বিশেষ করে সিলেটিরা কম মাইনেতে কাজ করতে রাজি; নিগ্রোরা মদ খায়, জুয়া খেলে বলে তাদের খাই বেশি। ২. দুই শিফটে এবং রবিবারেও কাজ করতে রাজি; নিগ্রোরা খ্রিস্টান, রবিবারে সাবাথ মানে। ৩. ইউনিয়ন এড়িয়ে চলে, স্ট্রাইক করতে চায় না। ৪. রাতভর মদ খেয়ে পরের দিন বেহুশ হয়ে পড়ে থাকে না বলে কাজকর্মে কামাই দেয় কম।
এই সিলেটিরা অনেকেই মেম বিয়ে করে ওদের একটা দু-আঁসলা সমাজ গড়ে তুলেছে এবং ঘটকালি করে এই মেমেরা নবাগত সিলেটিকে তাদের বোন-ভাগ্নি বিয়ে দেবার জন্য। বোন-ভাগ্নিও লন্ডনির বউয়ের কাছ থেকে জেনে গিয়েছে: ১. সিলেটি মদ খেয়ে মাতাল হয়ে বউকে ঠ্যাঙায় না।
