বাংলায় বাম আন্দোলন
যেকোনো আন্দোলন সূচনাকালে একটি মহৎ ও জনমুখী কার্যক্রম নিয়ে হাজির হয়। প্রাথমিক অবস্থায় সেটি কোনো শক্তি প্রয়োগ বা বিতর্কের সৃষ্টি করে না বললেই চলে। কিন্তু বাম আন্দোলন সেই ধারা ধরে রাখতে পারেনি। শীঘ্রই এটি এক ভীতিকর ও আতঙ্কজনক পরিস্থিতির গহ্বরে প্রবেশ করে। সশস্ত্র লড়াইয়ের লাইন গ্রহণ তার নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়। মহিউদ্দিন আহমদ উল্লেখ করেন, বাংলায় বাম আন্দোলনের শুরুতে ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে পূর্ব বাংলা থেকে ১২৫ জন এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পাঁচজন প্রতিনিধি যোগ দেন। ভারত বিভাগের পটভূমিতে তারা পাকিস্তানে পার্টির একটি স্বতন্ত্র কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তদানুসারে পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির ৯ সদস্যের একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়। পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ৬ মার্চ। পশ্চিম পাকিস্তানে পার্টির তেমন কোনো প্রভাব বা সংগঠন না থাকলেও পূর্ব বাংলায় এর দ্রুত বিকাশ ঘটে। এ দলের কর্মকৌশল ও কার্যপদ্ধতি সম্পর্কিত নীতি ও কার্যক্রম ছিল ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির অনুরূপ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির ভেতরে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে। পার্টি একপর্যায়ে ‘সশস্ত্র’ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ডাক দিলে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি তা অনুমোদন করে।[1]
মহিউদ্দিন আহমদ উল্লেখ করেন, ১৯৪৮-৫০ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠকদের নেতৃত্বে বহু বিক্ষিপ্ত কৃষক অভ্যুত্থান এবং লাগাতার কৃষক আন্দোলন পরিচালিত হয়। এসব অভ্যুত্থান ও আন্দোলনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল নেত্রকোনা জেলার সুসং দুর্গাপুরের হাজং উপজাতীয়দের বিদ্রোহ। এ আন্দোলন বেশ কয়েক বছর ধরে চলে। ১৯৪৬-৪৭ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় বর্গা চাষিরা ‘তেভাগা'[2] আন্দোলন চালায়। এ সময় পুলিশের গুলিতে অনেক কৃষক নিহত হয়। তেভাগার দাবি মেনে নেওয়া হবে—এ নিশ্চয়তা দেওয়া হলে আন্দোলন কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়। ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে নাচোলরে বর্গা চাষি ও পুলিশের মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষ হয়। এ ছাড়া খুলনার ধানিউনিয়া ও ডুমুরিয়া, যশোরের বরেন্দ্র দুর্গাপুর, চাঁদপুর ও এগারোখানে এবং সিলেটের বিয়ানীবাজারে কৃষক বিদ্রোহ ও পুলিশের সঙ্গে তাদের সশস্ত্র সংঘাতের ঘটনা ঘটে। পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির অনেক সংগঠক এসব ঘটনায় নিহত হন, এতে জড়িত থাকার কারণে অনেকে কারারুদ্ধও হন।
