হইয়াছেন। নীরস গদ্যে অরসিকজন তাহার ব্যাখ্যা করিতে গিয়া কেন। বিড়ম্বিত হইবে?
আমাদের পক্ষে শুধু সম্ভব সাধকগণের রসস্রোতধারার ভৌগোলিক উৎপত্তিস্থলের অনুসন্ধান করা। কোন পর্বত-কন্দরে তাহার উৎপত্তি, কোন দেশে প্রদেশের উপর দিয়া তাহার গতি, কোন মহাসমুদ্রে তাহার নিবৃত্তি সে অনুসন্ধান ভূগোল আলোচনার ন্যায়; তাহাতে জ্ঞানবৃদ্ধি হয়, রসাস্বাদনের প্রত্যক্ষ আনন্দ তাহাতে হয় না। গঙ্গার উৎপত্তি-নিলয় জানিয়া তাপিত দেহে গঙ্গাবগাহনজনিত স্নেহসিক্ত শান্তিলাভ হয় না, পুণ্যলাভ তো সুদূরপরাহত।
রসিকজন এই অন্ধের হস্তীদর্শনের ন্যায় বিড়ম্বনাকে লক্ষ করিয়াই বলিয়াছেন,
ফুলের বনে কে ঢুকেছে সোনার জহুরি
নিকষে ঘষয়ে কমল, আ মরি, আ মরি।
স্মৃতিশক্তি ক্ষীণ হইয়া গিয়াছে, তৎসত্ত্বেও মনে পড়িতেছে, পরমহংসদেবও বলিয়াছেন, মদ শুকিলেই নেশা হয় না, চাখিলে নেশা হয় না, এমনকি সর্বাঙ্গে মাখিলেও নেশা হয় না, নেশা করিতে হইলে মদ খাইতে হয়। অর্থাৎ সে রসসায়রে নিমজ্জিত হইতে হয়, পারে দাঁড়াইয়া সে অমৃতের রাসায়নিক বিশ্লেষণ করা পণ্ডিতের পণ্ডশ্রম। তাই বাউল বলিয়াছেন,
যে জন ডুবল, সখী, তার কী আছে বাকি গো?
তখন তো তাহার আর দুঃখ-যন্ত্রণা নাই, সে তো জন্ম-মৃত্যুর অতীত। রাজসিক কবি শ্রীমধুসূদন পর্যন্ত বলিয়াছেন :
মক্ষিকাও গলে না গো সে অমৃত হ্রদে
সৈয়দ শাহনূর গাহিয়াছেন :
রসিক দেখে প্রেম করিয়া যার দিলেতে ফানা,
অরসিকে প্রেম করিলে চোখ থাকিতে কানা।
ওজুদে মজুদ করি লীলার কারখানা,
সৈয়দ শাহনূর কইন দেখলে তনু ফানা ॥
যিনি ব্রহ্মানন্দে আত্মনিলয় (ফানা) করিতে সমর্থ হইয়াছেন, একমাত্র সে-ই রসিকের সঙ্গে প্রেম করিবে। তদভাবে তুমি চক্ষুষ্মন অন্ধ। এই দেহেই (ওজুদ) লীলার কারখানা মজুত। তাহা যদি দেখিতে পারো তবেই তুমি দেহের বন্ধন হইতে মুক্তিলাভ (ফানা) করিবে।
(শব্দতাত্ত্বিক লক্ষ করিবেন
ভাষার দিক দিয়াও এই চৌপদী রুবাইয়াৎটি হিন্দু-মুসলিম আধ্যাত্মিক সাধনার কী অপূর্ব সংমিশ্রণে গঠিত– রসিক, প্রেম, লীলা শুদ্ধ সংস্কৃত, চোখ কানা বাঙলা; ফানা ওজুদ মজুদ শুদ্ধ আরবি; কারখানা ফারসি কইন বাঙাল।)
অরসিক, অপ্রেমিককে এইসব সাধক কখনও করজোড়ে নিবেদন করিয়াছেন যেন ভৌগোলিক শব্দতাত্ত্বিক তর্কবিতর্ক করিয়া রসভঙ্গ না করেন, কখনও নিরুপায় হইয়া কাতরকণ্ঠে দিব্যিদিলাসা দিয়াছেন। তাই ক্ষমাভিক্ষা করিয়া অদ্যকার সভার রসভঙ্গ করি, কবিগুরু কৰ্তক নন্দিত সেই হাসন রাজার গীতি সংকলন হাসন-উদাসের সর্বপ্রথম গীতিটি উদ্ধৃত করিয়া এবং তৎপূর্বে এইমাত্র নিবেদন করি যে, সাধারণত বাউলরা পরমাত্মা মহাপুরুষ ও গুরুর বন্দনা সমাপ্ত করিয়া রস সৃষ্টি আরম্ভ করেন। কিন্তু হাসন রাজা অপ্রেমিক, রবাহুতের আগমন ভয়ে আল্লা-রসুল বন্দনার পূর্বেই বলিতেছেন,
আমি করিয়ে মানা, অপ্রেমিকে গান আমার শুনবে না।
কিরা দেই, কসম দেই, আমার বই হাতে নিবে না।
বারে বারে করি মানা বই আমার পড়বে না।
প্রেমের
