আর যেন কেহ না বলে,
আমি ভিন্ন এবং তুমি ভিন্ন।
ইহাই তো সত্য ধর্ম। এ মন্ত্র ব্রহ্মে বিলুপ্তির মন্ত্র এবং এ মন্ত্র বিবাহের মন্ত্র। খ্রিস্টসাধু যিশুকে বিবাহ করে, চার্চকে বিবাহ করে, শ্ৰমণ সঙ্ঘকে বিবাহ করে আর আমাদের মতো সাধারণ মানুষ প্রিয়াকে এই মন্ত্রে বরণ করিয়া সংসারপথে চলিবার শক্তি পায়।
.
০৪.
মুসলমান ধর্মপ্রচারকগণ এদেশে সুফি বা ইরানি ভক্তিমার্গ প্রচার করিলে পর হিন্দু-মুসলমান জনসাধারণের সম্মিলিত আধ্যাত্মিক সাধনার ফলে যেসব সাধক মধুরকণ্ঠে আত্মার রহস্য-লোকের অভিজ্ঞতার গান গাহিলেন তাহার সঙ্গে আমাদের সকলেরই অল্পাধিক পরিচয় আছে। কবীরের নাম শোনেন নাই এমন লোক কম ও যাঁহারাই ভারতীয়
কৃষ্টির সত্য, বহুমুখী প্রতিভার প্রতি সিংহাবলোকন করিয়াছেন, তাঁহারাই অন্যান্য নানা সাধকের ভজন দোহার সঙ্গে সুপরিচিত।
উত্তর ভারতে যেসব সাধক জনগণের হৃদয়মন ভক্তিরসে প্লাবিত করিয়া গিয়াছেন তাহাদের আংশিক পরিচয় মাত্র দিতে হইলেও বহু বৃহৎ গ্রন্থের প্রয়োজন। সংবাদপত্রের বিক্ষিপ্ত স্তম্ভের উপর সে বিপুল সৌধনির্মাণ করা সম্ভবপর নহে। অনুসন্ধিৎসু ও রসজ্ঞ পাঠক সে সৌধের সন্ধান পাইবেন শ্রীযুক্ত ক্ষিতিমোহন সেনের দাদু পুস্তকের ভূমিকায়, পুস্তকাকারে প্রকাশিত তাহার স্টেফান নির্মলেন্দু বক্তৃতায়।
উত্তর ভারতে এই সাধনার দ্বারা পূর্ব ভারতে প্রকাশ হয় আউল, বাউল, মুর্শিদিয়া, সাঁই, জারিগানের ভিতর দিয়া। সেসব গীতের সঙ্কলন এযাবৎ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে করা হয় নাই। দুইজন গুণী এই কর্মে লিপ্ত আছেন ও রসিকজনের সশ্রদ্ধ কৃতজ্ঞতা সঞ্চয় করিয়াছেন। রাজশাহী কলেজের অধ্যাপক মৌলবি মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন ও শ্রীহট্টের মৌলবি আশরাফ হোসেন বহু পরিশ্রম করিয়া নানা সঙ্কলন প্রকাশ করিয়াছেন। (এই মহান ব্রতে আত্মনিয়োগ করিয়া দ্বিতীয়োক্ত মহাশয় কয়েক মাস পূর্বে আসাম সরকারের নিকট হইতে যে কী উকট প্রতিদান পাইয়াছেন সে সম্বন্ধে আরেকদিন আলোচনা করিবার বাসনা রহিল)।
লালন ফকির, শীতালং শাহ, রাধারমণ, গোলাম হুসেন শাহ, হাসন রাজা, ভেলা শাহ, সৈয়দ জহরুল হোসেন, সৈয়দ শাহ নূর প্রভৃতি সাধক-মণ্ডলীর পরিচয় এইসব সঙ্কলনে পাওয়া যায়। আধ্যাত্মিক জগতে হঁহাদের অধিকার, দৈনন্দিন জীবনের নিম্নতম কঠিন কঠোর অভিজ্ঞতা হইতে আত্মার উচ্চতম রহস্যলোকের প্রতি ঘঁহাদের অভিযান যে কী পরম বিস্ময়জনক, লোমহর্ষক তাহা বর্ণনা করিবার মতো অভিজ্ঞতা তো আমার নাই। গ্রহচন্দ্রে, তারায় তারায় অনন্তের যে সুগম্ভীর বীণাধ্বনি প্লাবন মন্ত্রে মুখরিত, রুদ্রের ত্রিকাল ত্রিকোলস্পর্শী দক্ষিণ হস্তে যে রুদ্রাক্ষ জন্মমৃত্যু সৃষ্টিপ্রলয়ের অন্তহীন চক্রে ঘূর্ণায়মান তাহারই স্পন্দন নমস্য সাধকেরা অনাবিল চৈতন্যগোষ্পদে শতরাগে বিম্বিত করিয়া প্রত্যক্ষ দর্শন করিয়াছেন। পুনরাবৃত্তি করি, প্রত্যক্ষ দর্শন করিয়াছেন, উপনিষদের ঋষি যে প্রকারে দর্শন করিয়াছিলেন, মুতালিজা সুফি পঞ্চেন্দ্রিয়ের অতীত যে
ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যোগে পরমাত্মাকে দর্শন করিয়াছিলেন।
সে রহস্যলোকের ব্যঞ্জনা সাধকেরা দিয়াছেন মধুর কণ্ঠে, ছন্দগানে। রসিকজন শ্রবণমাত্র ভাবরসে আপ্লুত
