লাশের কফিন সাথে নিয়ে জেল চত্বরের বাইরে পা রাখল রূপকথার অজানা তরুণ।
মেইন গেট থেকে সামনে যেতেই হাতের ডানে আমদানি। জেলে আসলে সকলকেই এক রাতের জন্য আমদানিতে থাকতে হয়। এটি একটি বিশাল হলঘর। হাজার দেড়েক লোক থাকতে পারে অনায়াসে। এক পার্শ্বে ময়লা কম্বলের স্তূপ। অন্য প্রান্তে টয়লেট। আমদানির পাহারার দায়িত্ব রয়েছে কয়েদি তারামিয়া। আন্তঃজেলা ডাকাত দলের সর্দার। অসুরাকৃতির ঢাউস দেহ, বেঢপ চেহারা, আগুনের হলকার মতো চোখ, তিরিক্ষি মার্কা মেজাজ। গঞ্জিকা সেবনের আধিক্যে গায়ের মাংস লোপ পেয়ে হাড্ডি সর্বস্বে পরিণত হয়েছে। আমার কৌতূহল হলো। জেল পুলিশের বদলে কয়েদিদের কেন এহেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রাখা হয়েছে। কদ্দিনেই বুঝতে পারলাম, বৃটিশ রাজ্যের দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা অনেককাল আগে বিলুপ্ত হলেও জেলখানাগুলো ঔপনিবেশিক প্রভুদের নমুনা পবিত্র জ্ঞান করে অব্যাহত রেখেছে।
লঞ্চের ভেঁপুর মতো হেঁড়ে গলায় তারামিয়ার তীব্র চিৎকার-“ফাইল, ফাইল”। তৎক্ষণাৎ শুরু হয় গেল তারামিয়ার সহযোগীদের চড়-থাপ্পড়, কিল-ঘুষি, লাথি-গুঁতা ও কঞ্চির সপাং সপাং বাড়ি। তড়িতাহতের মতো চার কলামে সারিবদ্ধভাবে বসে গেলাম। এরপর শুরু হয়ে গেল গণনার পালা। জেলের ভাষায় গুনতি। গুনতি না মিললে যত যন্ত্রণা। গুনতি মিলতেই আবারও তারামিয়ার হেঁড়ে গলায় চিৎকার-জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণটা দে তো। সহযোগী মুহসীন তোতা পাখির মতো বাঁধাগৎ বলতে শুরু করল-“যদি লগে ট্যাকা-পয়সা, ঘড়ি-চেইন, নেশার গাঞ্জা-ভাং থাকে, অখ্যন জমা দিয়া দ্যান। পরে চেক কইরা পাইলে কিন্তু হাড্ডি গুঁড়া কইরা ফালামু। সাবধান! রাতে কুত্তা ঢুকে জুতা চুরি করনের লাইগ্যা। সকালে যদি কেউ কয় আমার জুতা নাই, তাইলে এই যে কঞ্চি দেখছস্-বাইড়াইয়া পাছার ছাল তুইল্যা ফালামু”।
জেল কোডে নিষিদ্ধ কোন জিনিস আমদানিতে সাথে না রাখাই ভাল। নগদ টাকা থাকলেও মেইন গেটে পারসোনাল একাউন্টে জমা করে দিবেন। জেলের ভাষায় যাকে বলে পিসি। কোন অবস্থায়ই পয়লা রাতে টাকা-পয়সা লেনদেন করবেন না। কদ্দিন বাদে লেনদেনের ব্যবস্থাটা নিজেই বুঝে উঠতে পারবেন। পিসি’র দোকান বসে শুক্রবার। দশ টাকার মাল পনের টাকা। শুধুমাত্র সওদা করার নিমিত্তে ভিজিটরস কাউন্টারে কুস্তি লড়ার চেয়ে বিশ-ত্রিশ পারসেন্ট চড়া দামে পিসিতে সওদা করাই ভাল।
জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ শেষ, গুনতিও শেষ। মনে হলো কষ্টক্লিষ্ট মানুষগুলোর এবার ঘুমের মওকা মিলবে। আমাদেরকে লাইনে বসিয়ে রেখে তারামিয়া ও তার গ্যাং ঘরের এক কোণায় কি যেন কানাঘুষা করে নিল। শুরু হলো
