জেলখানার দিনগুলি

« <
/ 81
> »

তল্লাশী অভিযান। কোথা হতে কি হলো বুঝে উঠতে পারলাম না। শুধু দেখলাম, হায়েনার দলের হরিণ শিকারের মতো তারামিয়ার দলবল আঠার/বিশ বছরের একটি যুবকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। উড়া-ধুরা কঞ্চির বাড়ি, কিল-ঘুষি। টেনে হিচড়ে ছেলেটিকে নিয়ে যাওয়া হল কোণায় বসা তারামিয়ার কাছে। প্রথমে গোটা দুই লাথি। অপরাধ! ছেলেটির গলায় সোনার মালা পাওয়া গেছে। পরে শুনেছি, ঐ আজগুবি মাইরটা মালা রাখবার অপরাধে নয়, মালাটির স্বত্ব ত্যাগ করানোর অপকৌশল মাত্র। বালক ফরিদ ঘূর্ণাক্ষরেও ভাবেনি, গলার মালা এমন করে প্রাণের জ্বালা হয়ে উঠতে পারে।

রাবণের বাণ সহ্য হয়, হনুমানের দাঁত খিচুনী সহ্য হয় না। রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নিয়ন্ত্রিত হতে নয়, নিয়ন্তা হতে অভ্যস্ত। অধিকারের প্রশ্নে গলা উচিয়ে কথা বলাটাই অভ্যাস। জীবনে এই পয়লা বার উৎকণ্ঠিত ও উদগ্রীব চিত্তে মুখে কুলুপ এঁটে বসে রইলাম এরপরে কি ঘটে তা দেখার জন্য।

ঐ বাজখাঁই মার্কা ভয়ঙ্কর লোকটির সাথে কথা বলার অহেতুক একটা প্রচণ্ড ইচ্ছা আমাকে পেয়ে বসল। নিজের পরিচয় দিতেই কিছুটা শীতল মনে হলো। বিশ্বাস করতেও কষ্ট হলো-এমন ভীতিকর মানুষের মধ্যে আবেগ-উচ্ছ্বাস থাকতে পারে। তারামিয়ার কথাগুলো আমার জীবনভর মনে থাকবে-“আমি তো ভাই মরা মানুষ। জিন্দা লাশ। আমার লগে কথা কইয়া কি অইব”। ওর সাথে আলাপ করে অনুমান হলো-সাত হাজার আসামীর এই জেলখানাটা টিকে আছে মিয়াসাহেব নামের আধমরা সিপাইদের তিনহাত লম্বা লাঠির জোরে নয় তারামিয়াদের পয়লা রাতের ভীতির ডরে।

জেলখাটিয়ে বন্ধুদের কাছে ঐতিহাসিক ‘ইলিশ ফাইলের’ গল্প শুনেছি। আজ স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হলো। সমুদ্রে ইলিশ শিকারী ট্রলারে ছোট ছোট খোপে লক্ষ লক্ষ ইলিশ মাছ গুদামজাত করার দৃশ্য যারা দেখেছেন তারা অনুমান করতে পারবেন-তারামিয়ার মানুষ ফাইলের সেকি বীভৎস রূপ।

একশ বিয়াল্লিশ জন আসামীর জন্য বরাদ্দ গুটিকয়েক কম্বল। জনপ্রতি একফুট জায়গা। হুকুম হতেই হেলপার চারজন তর্জনগর্জন করে, একজন করে আসামী চ্যাংদোলা করে ধরে এনে কাত করে ফেলেই হাঁটু ভেঙে দু’পায়ের ফাঁকে আটকে রাখে আর হাতের কঞ্চি দিয়ে পিঠের উপর কষে বাড়ি মেরেই কমন ডায়লগ “চাপ শালা”। ভয়ে কুঁকড়ে যাওয়া আসামীরা জড়সড় হয়ে ঘাপটি মেরে পড়ে রইল। শরীরের নাম মহাশয় যা সওয়াবেন তাই সয়। এই অবস্থার মধ্যেও অনেককে নাক ডেকে ঘুমোতে দেখেছি। বিবেক বিব্রত হলেও আমার ক্লান্ত শরীর মহাশয় জন-গণ-মন হতে পারল না।

« <
/ 81
> »