জেলখানার দিনগুলি

« <
/ 81
> »

ছেলেটির নাম রাসেল। বয়স ছয় বছরে পড়লেও দেখতে শুনতে, আকার আয়তনে এখনো কুলের শিশুর মতো। এক বছর হল জেলে আছে। বাড়ি টেকেরহাট, বাবার নাম কাওসার এইটুকু ছাড়া ওর আর কিছু মনে নেই। জেলে কি করে আসলো জিজ্ঞেস করলে চটপট উত্তর দেয় হারাইয়া গেছিলাম। বয়সে বড় ওর সহবন্দীরা বললো, প্রথম প্রথম মায়ের কথা মনে করে প্রায়শই কান্নাকাটি করতো। গত এক বছরে ওর মন থেকে আপনজনের স্মৃতি মুছে গেছে। এখন জেলই ওর বাড়িঘর। দিনমান মেন্টাল এরিয়া, দশ সেল, সাতাইশ সেল এলাকায় দৌড়াদৌড়ি করে, ছোটাছুটি করে ওর দিন কাটে। জীবনের মানে বুঝে ওঠার আগেই ওর জীবনের ঠিকানা হারিয়ে গেছে। এই অনাথ বালককে বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার কোন সরকারি উদ্যোগের ব্যবস্থা নেই। কোন একদিন মানবাধিকার সংস্থা হয় তো ওর কাছে একটি মুক্তির সনদ ধরিয়ে দিবে। হয়তো কিশোর রাসেল জেলখানার বাইরে পা রেখে এই অবাক পৃথিবীর চোরাগলিতে জীবনের সন্ধান না পেয়ে বলে উঠবে-জেলেইতো ভাল ছিলাম।

সাত বছরের বালক মুকুল থাকে স্কুল ৫-এ। এক বছর আগে ফকিরাপুল থেকে বোমাসহ গ্রেফতার হয়েছে। পরিবার-পরিজন, বিচার-আদালত কোন কিছুর সাথেই ওর যোগাযোগ নেই। বোঝেও না। বোঝার বয়সও হয়নি। ফকিরাপুলে কি করতো জিজ্ঞেস করতেই সোজাসাপটা উত্তর-ক্যান, ‘টোকাই আছিলাম’। টোকাই মুকুল জেলখানার পরিবেশের সাথে নিজেকে লাগসই করে নিয়েছে বলেই মনে হলো। অন্তত জীবনের বাস্তবতা বুঝে উঠার আগ পর্যন্ত ও যে জেলেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে সেটুকু ওর নিজের কথাতেই বোঝা গেল, “কি আর অইব! সাজা লমু।”

বন্দী শিশু-কিশোরদের মধ্যে যারা উচ্ছৃঙ্খল, পাজি ও বেশি মাত্রায় ত্যাঁদড়- ওদের সার্বক্ষণিক তালাবন্ধ করে রাখা হয় ১৪নং পানিশমেন্ট সেলে। ১৪নং সেলের বর্ণনায় এক কথায় বলা যায়- বীভৎস! রাস্তা থেকে ধরে এনে জেলে পুরে রাখা হয়েছে- এমন কিশোর বন্দীর সংখ্যাই বেশি। ওরা নিজেরা জানে না কি ওদের অপরাধ; কি কারণে ওদের জেলে নরকবাস করতে হচ্ছে। অনেকের অল্প মেয়াদের সাজাও হয়েছে। এনিয়ে ওদের কোন মাথা ব্যথা নেই। শুনেছে, সাজা হয়েছে- এটুকুই। কবে সাজা হলো, কি কারণে সাজা হলো, কোন আদালতে, উকিল কে ছিল- এর কোন কিছুই ওদের জানা নেই।

মনির নামের দশ বছরের ছেলেটির জামিন হয়েছে শিশু আদালতে। বিজ্ঞ বিচারক রায়ের শর্তে লিখেছেন- মা অথবা বাবাকে জামিন নামায় সই

« <
/ 81
> »