দিল। রফিক অচিরেই তার সকল দুঃসহ স্মৃতি ভুলে গিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসলো বটে, কিন্তু প্রাণচঞ্চলতা ও জওয়ানি রোশনাই চিরতরে হারিয়ে গেল।
অবুঝ পাগলের কার্ডে ডাইট পাস করায়ে অন্যত্র বিক্রি করার মতো অমানবিক বিষয়ও এখানে অহরহ ঘটছে। ডাক্তারের সাথে কোন বন্দীর বিরোধ ঘটলে মানসিক বৈকল্যের রিপোর্ট পেশ করে পাগল সেলে আটকিয়ে রেখেছেন এমনও ঘটনা আছে। কারা হাসপাতালটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে বিধায় জেল কর্তৃপক্ষের সাথে ডাক্তারদের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলে বারোমাস। জেলখানার সাত-আট হাজার বন্দীর মধ্যে পাঁচ হাজারেরও বেশি লোক সকল সময়ই চর্মরোগে আক্রান্ত থাকে। ফলে কারা হাসপাতালের প্রধান কাজই হচ্ছে খুঁজলির চিকিৎসায় ব্যস্ত থাকে। খোস-পাঁচড়ার আক্রমণে শরীর খসে পড়ার অবস্থা হয়েছে, এমন রোগীদের রাখা হয় তিন খাতার আট নম্বর ওয়ার্ডে। জেলের ভাষায় বলে, গেন্টু ওয়ার্ড। গেন্টু ওয়ার্ডের চিকিৎসা ব্যবস্থা যে কোন আদিমতাকে হার মানায়। সকাল বেলা উলঙ্গ করে মেডিসিন মিশ্রিত পানির সাহায্যে সারা শরীর ছালা দিয়ে ঘষে-মেজে পরিষ্কার করা হয়। কি অদ্ভুত চিকিৎসা ব্যবস্থা।
উনিশ: শিশু অপরাধীদের হালচাল
জেলখানায় শিশু জগতের চিত্র ভয়াবহ। চারটি একতলা ভবন ও একটি কিশোর পানিশমেন্ট সেল নিয়ে মেন্টাল এরিয়া। শিশু-কিশোরদের থাকার জায়গার নাম মেন্টাল কেন হলো বলতে পারিনে। তবে একটা কথা নিশ্চিত করে বলতে পারি যে অস্বাস্থ্যকর, নোংরা ও দুর্গন্ধময় পরিবেশের মধ্যে গাদাগাদি করে শিশুরা বসবাস করছে, তাতে ওদের মানুষ হয়ে বেড়ে ওঠার কোনই সম্ভাবনা নেই। হতাশার বিষয়, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে শিশু বন্দীদের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। কিন্তু বাড়ছে না ওদের থাকা-খাওয়ার সুযোগ-সুবিধা। জায়গার সংকুলান হয় না বলে, একজনের মাথা আরেকজনের পা, অর্থাৎ উল্টা-সিধা ৬৯ পদ্ধতিতে ওদের শোয়ার ব্যবস্থা। শখ করে ঢুকেছিলাম মেন্টাল ৫-এ। উটকো, গোমট ও ভ্যাপসা একটা বাজে রকমের তীব্র দুর্গন্ধ ধক করে নাকে ঢুকতেই বমি। আসলে, জেলখানায় শিশু-কিশোরদের দুর্বিষহ দুর্ভোগ ও দুঃসহ দুগর্তির কথা চোখে না দেখলে লিখে বোঝানো মুশকিল। দশ বছরের কম বয়সী শিশুদের রাখা হয় মেন্টাল ৫-এ। দাঁড়ি চুল পাকা একজন বৃদ্ধ কয়েদিকে রাখা হয় ওদের সার্বক্ষণিক দেখাশুনার জন্য। যে বয়সে হেসে-খেলে মায়ের কুলে ঘুমপাড়ানি গল্প শুনে সময় কাটানোর কথা সেই সময়ে পাঁচ বছর বয়সী জুলহাসের দিন কটে জেলখানার মেন্টাল ৫-এ। আশ্চর্য হলেও ঘটনাটি নিজের চোখে দেখা। অবিশ্বাস করি কি করে।
