মৃত্যুপথযাত্রীকে নিয়ে যাওয়া হয় ফাঁসি মঞ্চে। সার্চ লাইটের চোখ ঝলসানো আলো। মুহূর্তটির জন্য সকলেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, কখন ডিআইজি সাহেবের হাতের রুমালটি ভূ-পতিত হবে। সরে যাবে মৃত্যুকূপের পাটাতন। জেলার ছাড়াও উপস্থিত থাকেন একজন বিচারপতি, সিভিল সার্জন, ডিসি, এসপি, জল্লাদ ও তার সহযোগীবৃন্দ। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে দশ-বারোজন জেল সিপাই। ফাঁসির পূর্বে একজন মুন্সী ডেকে এনে আসামীকে গোসল, অজু, নামাজ-কালাম ও তওবাসহ যাবতীয় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে নেয়া হয়। বিচারপতির দেয়া নির্ধারিত সময়ে ডিআইজি সাহেব তার হাতের রুমালটি ছেড়ে দিতেই জল্লাদ পাটাতনের হ্যান্ডেল ধরে দিবে টান। সাথে সাথে খসে পড়বে মৃত্যুকূপের পাটাতন। মুহূর্তেই ফাঁসির দড়িতে লটকিয়ে যাবে জ্যান্ত মানুষটি। পুরো দেহটিই ঝুলতে থাকবে কূপের ভিতর। ওপর থেকে মৃদুকম্পমান ঝুলন্ত ফাঁসির দড়িটি দেখে মনে হবে রশিটি কেঁপে কেঁপে মৃত্যু যন্ত্রণার শেষ কটি প্রহর গুনছে। তিরিশ মিনিট পর ঝুলন্ত দেহটিকে টেনে তোলা হবে। ডাক্তার সাহেবরা ঘাড় ও হাত-পায়ের রগ কেটে মৃত্যুকে নিশ্চিত করেন। শেষ রাতে লাশ হস্তান্তর করা হয় পরিবারের কাছে। লাশ নেয়ার কেউ না থাকলে কিংবা সামাজিক লজ্জায় পরিবার লাশ নিতে না চাইলে সরকারি আয়োজনে কবরস্থ করা হবে এবং এর সাথে ইতি ঘটবে একটি জীবন নাটকের। অনেক আগের কথা, ফাঁসি শেষে পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করার পর দেখা গেল লোকটি মরেনি। সেই থেকে নাকি রগ কাটার এই বর্বরতা শুরু হয়েছে। সবকিছুর পরও ফাঁসির সেলের এক নম্বর কক্ষের দেয়ালে মৃত্যুর পূর্বে আমের খোসা দিয়ে লেখা মুনিরের কথাগুলো হৃদয় ছুঁয়ে যায়, ‘শারমীন, মৃত্যুর পর তোমার আত্মার কাছে আমি কি জবাব দেব।’
ফাঁসির ঘটনা নিয়ে যুগ-যুগান্তরে অনেক জানা অজানা কাহিনীর জন্ম হয়েছে। ফাঁসির আদেশ হয়েছিল, পরে হাইকোর্ট করে যাবজ্জীবন সাজা বহাল হয়েছে। ছেলেটির নাম পাখি। পাখি তখন ফাঁসির সেলে। পরিবারের সবাই দেখতে এসেছে। ভালবাসা ছিল চাচাতো বোনের সাথে। বিয়েরও পাকা কথা ছিল। শেষ দেখা। হঠাৎ ছেলেটি এক অবাক কাণ্ড করে বসল। তার ভালবাসার মানসীকে কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরেই এক কামড়ে গালের খানিকটা মাংসপিণ্ড ছিঁড়ে নিল। পাখিকে এর কারণ জিজ্ঞেস করেছি বহুবার, এড়িয়ে যেতে চায়। জেলে ওর গানের গলার খুব নাম। ভালবাসার মানুষ যাতে আমৃত্যু ওর দেয়া চিহ্ন বয়ে বেড়ায় এই জন্য হয়তো এই পশুসুলভ আচরণ।
