জেলখানাকে কেন ঠিকানা করে নিয়েছেন, সেই গুঢ় রহস্য উন্মোচন আমার সাধ্যের বাইরে। তবে, শরৎ বাবুর সাহিত্য তত্ত্বের মারপ্যাঁচ থেকে এই কথাটা বলা অন্যায় হবে না যে, “প্রমাণ না হয়েও অনেকে জেলে যায়, সেটা জজ সাহেবের হাতে। আমরা যেটা বুঝতে পারি না, তিনি সেটা বোঝেন। আবার তুমি-আমি যেটা জলের মতো সোজা দেখি, খুব বড় জজ সাহেবের কাছে হয়তো সেটা পাহাড়-পর্বত।” নিয়তির কি নির্মম পরিহাস, যে ওবায়দুর রহমানের স্মৃতিচারণ করে শাহ মোয়াজ্জেম সাহেব তার কারাস্মৃতির ‘নিত্য কারাগারে’ বইটি শুরু করেছিলেন, আজ জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় জেলহত্যা মামলায় অভিযুক্ত হয়ে দু’জনই একই সেলে বন্দী দিনাতিপাত করছেন।
কর্তৃপক্ষের নির্দেশ, নামাজের আগে পরে ওয়াজ-নছিহত চলবে না। এরই মধ্যে ইমাম সাহেবকে পাশ কাটিয়ে এক হুজুর নামাজের নিয়মকানুন বর্ণনার সুযোগে স্বল্প সময়ের মধ্যে চমৎকার করে বয়ান সেরে নিলেন। পরে জেনেছি, লোকটি বউ মার্ডার কেইসে দণ্ডপ্রাপ্ত জীবন সাজার আসামী মেজর হালিম। জেলখানায় এটাই একমাত্র ঈদের জামাত ছিল না। সকল বন্দী যাতে একত্রিত হওয়ার সুযোগ না পায়, সেই ভাবনাকে মাথায় রেখে ভিন্নস্থানে ও বিভিন্ন সময়ে মোট চারটি ঈদের জামাতের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে, পূজাপার্বণে ও বিশেষ দিনে বন্দীদের উন্নত খাবার পরিবেশনের বিধান আছে। সকাল বেলা রেডিওর খবরে তেমনই শুনেছি। আদতে পাওয়া গেল একবাটি সেমাই। যাকে সেমাই না বলে স্যাকারিনযুক্ত আটার জাউ বলা সঙ্গত হবে। রাতে একথালা পোলাউ ও গুটিকয়েক গোমাংসের টুকরা। চালটাকে পোলার চাল বলা গেলেও, ওতে বাহারি কোন ময়মশলার ছোঁয়া যে পড়ে নাই, তা পরখের জন্য চেহারা দর্শনই যথেষ্ট, মুখে দেয়ার দরকার হয় না। নামাজ সেরে দশ সেলে ফিরে এসেছি। শুরু হলো নামাজোত্তর কুশল বিনিময় পর্ব।
আমরা ডিটেনশনের আসামী। নিরাপত্তা বন্দী। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি করিয়ে নিয়েছে পিন্টু ভাই-এর বউ কল্পনা ভাবী। কবিতা সেই রকমই লিখেছে। দিন কয়েক ধরেই ঈদের অপেক্ষায় আছি, পরিবার পরিজনের সাথে মিলনের প্রত্যাশায়। সময়ের ঘড়ি এগুতে চাইছে না যেন। সকাল এগারটা নাগাদ পিন্টু ভাইয়ের বাসা থেকে ছোট্ট একটি চিরকুট এলো। মুহূর্তেই একটা বিবর্ণ বিষাদের মলিন ছায়া আচ্ছন্ন করে নিল প্রত্যাশার সোনালী দিগন্তকে। বিধি বাম, আওয়ামী সরকার বাহাদুরের নির্দেশ, আমাদের দেখা সাক্ষাৎ চলবে না। কম্পমান হস্তযুগলের মাঝের ঐ ক্ষুদে পত্রখানি দিয়ে মুখ ছাপিয়ে চাপা কান্নায়
