সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তা হবো। তদ্দিনে আমি বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছি। ‘৮৯ এর ডাকসু নির্বাচনের প্যানেল পোষ্টারে ছবি দেখে বড় ভাই রাজনীতির খবর জেনে বিরাগভাজন হবেন এই ভেবে পল্লবী এলাকায় ভাইয়ের চলাচলের রাস্তার দুপার্শ্বের সকল পোষ্টার অতি সন্তর্পনে তোলে ফেলেছিলাম। ‘৯০-এর ডাকসু নির্বাচনে জিয়া হল ছাত্র সংসদের ভিপি হলাম। বিএনপি ক্ষমতায় এলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সিনেটর হলাম। বাবা ও বড় ভাই বুঝলেন, সরকারি নকর হওয়া আমার কর্ম নয়। রাজনীতির এই পথ চলাকে একসময় মেনেও নিলেন। বিরোধী দলে এসে নানামুখী হয়রানি ও মামলায় জড়িয়ে গেলাম। বাবা গ্রামের সরল-সহজ মানুষ। আমাকে নিয়ে ভীষণ টেনশন করতো। মাকে বলতো, ‘জেলে গেলে মানুষ বলবে কি? দেখ, ওর চিন্তা করতে করতেই একদিন মরে যাব’। হলোও তাই।
জেলে যাবার পর যখন সহকর্মীরা দলে দলে বাড়ি এসে সমবেদনা জানিয়ে গেল এবং ছাড়া পাবার পর যখন আশেপাশের গ্রামের অসংখ্য মানুষ ওদের ভাষায় ‘রাজবন্দী’ দেখতে বাড়ির আঙ্গিনায় ভীড় করছিল বাবা তখন বুঝতে পেরেছিলেন চোর-বাটপাড় আর রাজনৈতিক কর্মীর জেলজীবন এক কথা নয়। মাকে বলতে শুনেছি, বাবা প্রায়শই নামাজান্তে জায়নামাজে বসে আমার জন্য কান্নাকাটি করতেন। আজ বাবা নেই। অন্যান্য ভাই বোনদের মতো বাবার জন্যে আমার কিছুই করা হয়ে উঠেনি। তবু জেলে বসে, থেকে থেকে কেবলই মনে হয়েছে, বাবা আমার কাছের মানুষ ছিলেন, বন্ধু ছিলেন।
জেলখানার সবচেয়ে সুখকর বিষয় জামিনের স্লিপ। আবার এই জামিনের স্লিপ হাতে পেয়ে কারাগারের সহবন্দীদের ছেড়ে যাবার সময় প্রায় সকলকেই কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখেছি। অচেনা অজানা মানুষগুলো একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বসবাস করতে করতে একসময় নিজেরা এক মায়ার সংসার গড়ে তোলে। কেউ যায়, কেউ আসে। ভাঙা গড়ার এই খেলা হরদম চলছেই।
বন্দীদের মাঝে একটা কথা প্রচলিত আছে-জেলজীবন হলো আপনজন চেনার এসিড টেস্ট। আসলেও, আইডিয়াটা মন্দ নয়। দুর্গত জেলজীবনের এই অসহায় সময়ে যারা অনুগ্রহ করে খোজ-খবর করেন, প্রকৃত অর্থেই তার হয় ভাল বন্ধু না হয় পরিবারের আপন জন। দু’একদিন কেউ খোঁজ না নিলেই নিজেকে বড় বেশি অসহায় মনে হতো।
লালবাগের খুনের আসামী পলাশ। সাত বছর জেলে আছে। আরো কতকাল থাকতে হবে কে জানে। কিন্তু এই অনিশ্চিত জেল জীবন ওর মন থেকে ভালবাসার ভাবানুভূতিকে কেড়ে নিতে পারেনি। সকাল সকাল গোসল করে,
