জেলখানার দিনগুলি

« <
/ 81
> »

দিল। এতটুকু মান বাঁচাতে গিয়ে এমন করে যে লজ্জার পাহাড় ভেঙ্গে পড়বে, ঘুর্ণাক্ষরে তা ভাবি নাই। ঠাট বজায় রাখতে, ওষ্ঠাধরে একটা বিষাক্ত হাসির অতিসূক্ষ্ম আভাস টেনে রাখার ব্যর্থ প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে আমদানিতে ঢুকে গেলাম। সাত সকালে আরেক দফা অপদস্থ হওয়ার জন্য মনে মনে প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। হাঁফ ছেড়ে বাঁচালাম তখন, যখন ডাকসাইটে শরীয়ত উল্লাহ মাঝরাতে গেইটের কাছে এসে কানে কানে জানতে চাইলো, এই টাকার উপর আমার কোন দাবি আছে কিনা? বুঝলাম, ওর পকেটস্থ হলে আমার ঝামেলা থাকে না। অনুমান হলো, শরীয়ত উল্লাহর এতোসব হুমকি-ধমকি জেলখানার ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, অতিমাত্রায় ঘুষ আদায়ের অপকৌশল মাত্র।

বিধাতা সকলকে সমান করে তৈরী করেন নাই। তাই আদম সুরৎ নিয়ে কথা বলাও সঙ্গত নয়। তারপরও মানুষে মানুষে ভেদ প্রভেদ থাকে। চলনে বলনে, চাহনিতে এই ভিন্নতা স্পষ্ট। এমন কিছু মানুষ আছে যাদের চেহারাতেই একটা ছোকছোক ভাব ও ছ্যাঁচরামীর ছাপ লক্ষ্য করা যায়। এমন একজন কারারক্ষীর নাম তবারক। ওকে দেখলেই আমার ভীষণ রাগ হতো। রমযান মাসের শেষের দিক। ইফতারীর আয়োজন চলছে। জেলখানায় কাটাছেঁড়ার কাজ হয় খণ্ড টিনের টুকরা দিয়ে। জেলের ভাষায় বলে কাটনি। হঠাৎ কোথেকে তবারক এসে হরহর করে রুমে ঢুকেই কাটনিটি পকেটে ভরে রওনা হলো। অনেক বলে কয়ে, অনুনয় বিনয় করেও কোন কাজ হলো না। তবারকের এক কথা “রমজান মাস। সরকারের বেতন খাইয়া সরকারের সাথে নিমকহারামি করা যাইব না”। কথা শুনে মনে হচ্ছিল, বাকি এগার মাস সরকার ওকে একচেটিয়া নিমকহারামির লাইসেন্স দিয়ে ধন্য হয়েছে। কি আর করা। পিন্টু ভাইয়ের শরণাপন্ন হতে হলো। রাজনৈতিক পরিচিতি, পুরানো ঢাকার আঞ্চলিক প্রভাব ও দেদারছে টাকা খরচের সুবাদে মিয়াসাবদের উপর পিন্টু ভাইয়ের ছিল ব্যাপক প্রভাব। কোন কথা নেই, পিন্টু ভাই এসেই যথারীতি মিয়াসাবের পকেটে হাত ঢুকিয়ে জোর করে কাটনি বের করে নিলেন। সন্ধ্যায় লকআপের পর এসে তবারক হাজির। বোঝা গেল, কাটনি ফেরত নিয়ে নেওয়ায় তবারক ওর পাওনা নিতে এসেছে। বিশ টাকা পেয়ে ভীষণ নাখোশ। পঞ্চাশ টাকা চাই। কম্বলের ভিতর থেকে মাথা উঁচু করে পিন্টু ভাই আড়চোখে তাকাতেই তবারক পগার পাড়।

জানুয়ারীর আঠারো তারিখ ২০০০। নিত্যদিনের অভ্যাস মতো সাত সকালে ট্র্যাকস্যুট পরে দশ সেলের বাগানে পায়চারী করছিলাম। বাগানের দক্ষিণের দেয়াল ঘেঁষে

« <
/ 81
> »