জেলখানার দিনগুলি

« <
/ 81
> »

এলাকায় সেদিন থাকতো খুশির দিন। তাছাড়া, মিয়াসাবরা নিয়ম মাফিক ডিউটি করলে গড়পড়তায় বন্দীদের জেলজীবন যে দুর্বিসহ হয়ে উঠতো তাতে কোন সন্দেহ নেই। মিয়াসাবরা সকল সময় এই অল্প ক’টা টাকার লোভেই এতোসব অনিয়ম দেখেও দেখে না, এমন নয়। শুধুমাত্র এক কাপ চা ও একটি সিগারেটের জন্যে সেল এলাকায় নিশিরাতে এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে নিরন্তর ফুট-ফরমায়েশ খাটে, এমন কথা বলাও অন্যায় হবে। মোটকথা, বন্দী ও কারারক্ষী একে অপরের বন্ধু। পরস্পরের প্রয়োজনের নিমিত্তেই গড়ে উঠে এই পারস্পারিক নির্ভরশীলতা ও অকৃত্রিম বন্ধুত্ব। ফলশ্রুতিতে, ভাল থাকে দু’পক্ষই। তবে, দু’একজন আছেন বড়ই কাটখোট্টা। ডাকলেই ক্ষেপে যায়। জেলের ভাষায় এদের বলে, পল্টিবাজ মিয়াসাব। দিনবদলের পালায় বিলাতি সম্রাজ্যের রেখে যাওয়া পুরানো জেল বিধানই যখন পাল্টানো গেল না, তখন কারা প্রশাসনের এই ছোটখাটো নিম্নবেতনভুগী কর্মচারীদের ব্যক্তি বিশেষের এহেন দোষত্রুটি আমার কাছে খুব একটা মুখ্য বিষয় বলে বিবেচিত হয়নি। তবে, এ জাতীয় সিপাই বরকন্দাজের আচরণ যে শিষ্টাচার ও ভব্যতা বিবর্জিত, এ কথা বলা অন্যায় হবে না।

আমার দ্বিতীয় কারাবাসের পয়লা রাতে এমন একজন পল্টিবাজ মিয়াসাবের পাল্লায় পড়ে সেকি বেহাল অবস্থা! এতগুলো জুনিয়র সহকর্মীর সামনে আমার অপমানের অন্ত রইলো না যেন। মিয়াসাব মহাশয়ের নাম শরীয়ত উল্লাহ। পদে কনস্টেবল। হুমকি-ধমকি ও চলন-বলনের কায়দা-কানুনের বাহার দেখে কিছুতেই পদমর্যাদা ঠাওর করে উঠতে পারছিলাম না। রমজান মাস। সেহেরী না খেয়ে রোজা রাখা যায় না, এমন নয়। কিন্তু সহবন্দী খালেকের প্রেয়সীর দেয়া ভাত-তরকারী সাথে এনেছিলাম বলেই গোলটা বাঁধল। বিশ টাকা অফার করতেই ভীষণ মাইও করলেন। আসল গণ্ডগোলটা বাঁধল তখন, যখন আমি মাতৃভাষা ছেড়ে দু’চার বাক্য ভিনদেশী ভাষা বলতে শুরু করেছিলাম। আর যায় কোথা। মিঃ শরীয়ত উল্লাহ তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল। তল্লাশী না করে আমাকে কিছুতেই ছাড়বেন না, বাড়তি টাকা দিলেও না। চেক করে আমার কাছ থেকে সাতানব্বই টাকা উদ্ধার হলো। বলা হলো, বিচারের জন্য পরদিন সকালে আমাকে কেইস টেবিলে সোপার্দ করা হবে। আমরা কেমনতর ছাত্রনেতা, কি শিখেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রতিবাদ নিষ্ফল বুঝে আর কথা বাড়ালাম না। শত শত ঔৎসুক দৃষ্টির সম্মুখে যেন আমার আর লজ্জা করবারও অধিকার ছিল না। শরমের একটা অনাকাঙ্ক্ষিত মুখাবরণ যেন নিমিষে দিগন্ত বিস্তৃত করে কুৎসিত লজ্জায় আমার আপাদমস্তক আচ্ছন্ন করে

« <
/ 81
> »