জেলখানার দিনগুলি

« <
/ 81
> »

সকাল-বিকাল। রাতে দুই ঘণ্টা পর পর। জামায়াত নেতা আব্বাস আলী খান তাঁর কারা স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে মিয়াসাবদের এহেন আসা-যাওয়া নিয়ে বলেছেন, “কবরবাসীদের দেখা হবে মুনকির-নকীরের সঙ্গে, এটা হাদিসের কথা। এখানে দুবেলা দুজন মুনকির-নকীর আসতো, রাতের আধারে আসতো ঘন ঘন”।

মিয়াসাবদের উপাখ্যান লিখতে হলে আমার দ্বিতীয় কারাবাসের সহবন্দী হাজারিবাগের কালার কথা না বললেই নয়। অদ্ভুত মানুষ এক। কথার পৃষ্ঠে কথা বলা ও প্রত্যুৎপন্নমতিতে কালার জুরি মেলা ভার। সাত বছর ছিল মধ্যপ্রাচ্যে। প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান তেমন না থাকলেও পার্থিব জ্ঞানের ভাণ্ডার যেন বিধাতা ওকে ভরপুর করে দিয়েছেন। গ্রেফতারের পর পত্রিকায় ওর নাম উঠেছিল পাকিস্তানী কালা। এর শানে নুযুল জিজ্ঞেস করতেই বললো-“বুঝলেন না, পাকিস্তানী নাম দিয়া থানায় ঘাড় দিওনের লাইন করছিল আর কি?” জেলখানায় আটশ মিয়াসাবের মধ্যে কালাকে চিনে না এমন সংখ্যা নেহায়েত কম। দিনের বেলা কালার বেশিরভাগ সময় কাটতো দেখার গেইটে। নিজের চোখে দেখা, জেলখানার কম-বেশি আট হাজার বন্দীর মধ্যে একমাত্র কালাই বিনা স্লিপে হরহর করে দেখার গেইটে চলে যেতে পারতো বিনা বাধায়। অনেক রাজনৈতিক বন্দী ও টপটেররকে দেখেছি, গেইট হতে রিস্কি মালামাল বহন করতে কালার উপর নির্ভরশীল হতো। সকলের সেবায় নিয়োজিত কালার দিনমান গেইটে যাতায়াত ও মিয়াসাবদের দফায় দফায় উৎকোচ প্রদানের কারণে মিয়াসাবদের ওপর ছিল ওর ব্যাপক প্রভাব ও প্রচুর জনপ্রিয়তা। কালাকে দেখলেই দশহাত দূর থেকে সেলামির প্রত্যাশায় সেকি লম্বা লম্বা সালাম, প্রাণহারা হাসি! কালাও এক আজব মানুষ। সাফ জবাব “হাইস্যেন না, ট্যাকা ছাড়াতো কথা কন না।” যেসব মিয়াসাব ক্যারাব্যারা করতো তাদের ওপর কালার সেকি জারি-জুরি, “তোর নম্বর কতো? কয়দিন অইল ঢাকা জেলে আইছস? ব্যাটা চিনছ আমারে? আমরা লালবাগের পোলা। জেলডাইতো আমগো জায়গার উপরে। বেশি ক্যারাব্যারা করলে, গেইটের বাইরে পাইলে কানের লত্তি কাইট্যা রাহুম কইলাম”। মিয়াসাবরাও ওকে কখনো বন্ধু, কখনো ভাল দেনেওয়ালা ঠাওর করে চলাচলের সহজ ব্যবস্থা করে দিত। সত্যি, দুঃসহ জেলজীবনকে সহনীয় করে নেয়ার সকল কায়দা-কানুন কালা আত্মস্থ করে নিয়েছে। জেলটাই যেন ছিল ওর বাড়িঘর। ওর কথা একটাই, “টাকা দিবেন দুইশ, মাল কি দিলেন দ্যাহনের টাইম নাই। বুঝলেন না, ওগো নজরতো পকেটের দিকে, ব্যাগে কি আছে হেইদিকে খবর নাই।”

কারারক্ষীদের আদ্যোপান্ত ব্যাখ্যা করা বড় মুশকিল। কখনো বন্ধু, কখনো শত্রু। এই

« <
/ 81
> »