জেলখানার দিনগুলি

« <
/ 81
> »

চিমিস্ট আখের গুড়। জেলের ভাষায় এই রুটিকে বলে ফাইলের নাস্তা বা ফাইলের রুটি। গুড়কে গুড় না বলে ঝোলা গুড়ের কালো ‘গাদ’ বলা সমীচীন হবে। রাত দশটা থেকে বড় চৌকায় এই রুটি বানানোর কার্যক্রম শুরু হয়ে চলে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত। কাজেই পয়লা রাতে ভাজা রুটি যদি ভাগে পড়ে, তাহলে সেরেছে। গণ্ডারের চামড়ার মতো ঐ রুটি এমনই শক্ত যে, মিনিট কতক পানিতে ভিজিয়ে রাখা ছাড়া দাঁতে কাটা আদৌ সম্ভব নয়। রুটি বানানোর ডিউটি শেষে নাইট চৌকার লোকজন যখন ফিরে আসে তখন ওদের হাঁটু পর্যন্ত আটার স্তর ও নোংরা-দুর্গন্ধময় কাপড় চোপড় স্বচক্ষে দেখলে কোন রুচিসম্মত মানুষের পক্ষে সজ্ঞানে ঐ রুটি ভক্ষণ সম্ভব নয়। পেটের জ্বালা বড় জ্বালা। বিস্বাদ হউক, কিন্তু পর্যাপ্ত হলে অন্ততঃ বেঁচে থাকবার উপায় হয়। যারা ফাইলের নাস্তা খায় না, এমন বন্দীদের রুটিটি পাওয়ার প্রত্যাশায় অনেক নিরীহ বন্দীকে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি।

এক রুটিতে পেট ভরে না এমন অনেককে দেখেছি নাইট চৌকার বাবুর্চিদের কক্ষের সামনে সকালবেলা রুটি কেনার জন্য ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। প্রয়োজনের কমতি খাবার দিয়ে বন্দীদের বাড়তি শাস্তি প্রদানের এহেন নিষ্ঠুর ব্যবস্থা বড়ই মানবেতর।

দুপুরবেলা: এক থালা ভাত ও এক বাটি খেসারির ডাল। এমনিতেই নিম্নমানের চাল, তার উপর অসংখ্য পাথরকণা মিশ্রিত। বলা হয় জেলখানার ভাতে চালের চাইতে পাথরের সংখ্যা বেশি। বেখেয়ালে চিবুতে গেলে দাঁত ভাঙার সম্ভাবনা শতভাগ। ডালের অবস্থাও অথৈবচ। খেসারির ডাল, তাও ভাতের ফেন মেশানো। আমরা গরিব দেশের মানুষ বটে। কিন্তু সমাজের কোন স্তরে খাবারের মান এখনো এতটা অবনতি ঘটেছে বলে মনে হয় না। এক সপ্তাহে দুপুরে ভাত দিলে পরের সপ্তাহে দুপুরে দুইটি করে রুটি ও এক বাটি ডাল। শ্রেণী নির্বিশেষে সকলের জন্য একই বরাদ্দ। রাতে এক থালা ভাত ও এক বাটি সবজি। সবজি বলতে বোঝায় চলতি বাজারের সবচাইতে কম দামের তরিতরকারির নিরামিষ। তৈল-নুন, হলুদ-মরিচ এর বালাই নেই। এক রাতে সবজি দিলে পরের রাতে এক টুকরো ভাজা মাছ অথবা দুই-তিন পিস গরুর মাংস। মাছের কোয়ালিটি ভাল। তবে গরুর মাংসের চেহারা দেখলে কাঠ কয়লার টুকরো মনে করে ভুল হতে পারে। জেলের বড় কষ্ট, খাবারের কষ্ট। অভাগা বন্দীদের পেটে লাথি মারার এই অনিয়ম আর কতকাল চলবে জানি না।

« <
/ 81
> »