আই,জি সাহেব জেল পরিদর্শন আসবেন। জজমিয়ার যতোসব কূটবুদ্ধি। ডি, আই, জি মহোদয় এসে দাঁড়িয়েছেন চৌদ্দ সেলে জজমিয়ার কক্ষের সামনে। হঠাৎ জজমিয়ার চিৎকার “স্যার, আমাকে একটা ব্লেড দেন।” চারিদিকে পিনপতন নীরবতা, কর্মকর্তারা সকলেই হতভম্ব হয়ে ভয়ে জড়োসড়। সাহেব ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, এই ছেলে ব্লেড দিয়ে কি করবে? এমন একটা মুহূর্তের জন্যই যেন জজমিয়া অপেক্ষা করছিল। “কি করুম, দেখবি।” কথাটি বলেই লুঙ্গীর কোঁচড় থেকে একটা ঝকঝকে ব্লেড বের করে নিজের পেটের উপর আড়াআড়ি ফাঁড় দিতে শুরু করলো। প্রহরীদের হস্তক্ষেপের আগেই সারা পেট কেটেকুটে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। রক্তে ভেসে গেল পুরো কক্ষ, জজমিয়ার মুখে কিন্তু কোন কষ্টের ছাপ নেই। উপরন্তু কর্মকর্তা, তটস্থ কর্মচারীদের, ব্যতিব্যস্ততা দেখে জজমিয়ার সেকি বিদ্রূপের হাসি! তৎক্ষণাৎ জজমিয়াকে নিয়ে যাওয়া হলো কারা হাসপাতালে।
আমার দশ সেলের রুমমেট সহবন্দী কমিশনার চৌধুরী আলম তখন উপযুক্ত মাসোহারার বিনিময়ে সুস্থ শরীরে কারা হাসপাতালে রোগীর বিছানায় শুয়ে বন্দী জীবন কাটাচ্ছে। ভারি মজার লোক। সেই যে ‘৭১-এর রণাঙ্গনে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন, সেই থেকে রাজনীতিতে সক্রিয় আছে। যাকে বলে মাঠের মানুষ। তবে, রাজনীতির মাঠে লোকটির কর্মের তুলনায় প্রাপ্তি ঘটেছে নিতান্তই কম। অর্ধশত বছরের বয়সের সীমানা ছাপিয়ে কখন যে আমাদের তারুণ্যের বন্ধু হয়ে উঠেছিল টেরই পায়নি। যখন চেতনা হলো, তখন চৌধুরী ভাই মধ্যাহ্নের ভাতের থালা ঠেলে দিয়ে মুক্তির সনদ নিয়ে মেইন গেইটের দিকে ছুটছে। আমরা পথ চেয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। চোখের কোণে একফোঁটা আনন্দাশ্রু এসে লুকোচুরি খেলে গেল। সেই সাথে একটা অসম্ভব বিষণ্ণতা এসে গ্রাস করে নিল সকলকে।
মনে মনে অনুরণিত হলো, গুডবাই, চৌধুরী আলম, গুডবাই। যে কথা বলেছিলাম, চৌধুরী ভাইয়ের বিছানার পার্শ্বে মেঝেতে ফেলে তিন ঘণ্টা ধরে জজমিয়ার পেটের সেলাই কর্ম চললো। সেলাই পড়েছে ২০৩টি। চৌধুরী আলমের মুখে শুনেছি, তিনঘণ্টার সেই দুঃসহ সেলাই যন্ত্রণায় জজমিয়া একটু টু-শব্দ পর্যন্ত করেনি। উপরন্তু আধ-ঘন্টা পর হঠাৎ হা হা করে অট্টহাসির শব্দ। রীতিমতো বিস্ময়কর। ওয়ার্ডের সকলেই ঔৎসুক্য নয়নে তাকিয়ে রইলো, কি হয়, কি হয়! চৌধুরী ভাই বললো, সকাল বেলা ঘুম ভাঙ্গতেই ছেলেটির কি অবস্থা হয় দেখার জন্য চোখ মেলেছি। জজমিয়া নেই। দেখি, বারান্দায়, এপাশ ওপাশ হাঁটাহাঁটি করছে। দেখে কে বলবে, কাল ছেলেটির শরীরে দুইশতাধিক সেলাই পড়েছে।
খাতা এলাকার ওয়ার্ড পাসের বিষয়টিও
