নেই। আমার দ্বিতীয় কারাবাসের বেশীরভাগ
সময় কেটেছে সোহেল ভাইয়ের সান্নিধ্যে। হাবীব-উন-নবী সোহেল, ভারি
চমৎকার মানুষ। রাজনীতির অনাবশ্যক জটিলতা ওনার সাংস্কৃতিক
মননশীলতাকে এখনো কেড়ে নিতে পারেনি। মাঝ রাতে লোহার গরাদ ধরে
আকাশের দিকে তাকিয়ে সোহেল ভাই যখন দরাজ গলায় আবৃত্তি শুরু করতো,
তখন ক্ষণিকের জন্যে হলেও জেলখানার সমস্ত বেদনা ভুলে যাবার উপায়
হতো। ডেল কার্ণেগীর মতে, কারো সমালোচনা না করে থাকতে পারাটাই যদি
উত্তম মানুষের অন্যতম গুণ হয়ে থাকে, সেই অর্থে সোহেল ভাইকে নিখাদ
ভালো মানুষ বলাটা অন্যায় হবে না। কালের আবর্তে যারা এই দশ সেলে
থেকে গেছেন তাদের মধ্যে আছেন তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া থেকে
শুরু করে হালের শেখ মুজিব হত্যা মামলা ও জেলহত্যা মামলার আসামীরা।
শুনেছি, এই দশ সেলে একবার জুলফিকার আলী ভুট্টো এসেছিলেন তার এক
পরিচিত জনের সাথে দেখা করতে। ষাটের দশকের শুরুতে মানিক মিয়া,
খন্দকার মোশতাক, শাহ মোয়াজ্জেম, কে এম, ওবায়দুর রহমান, হাফেজ
মুসাসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রায় উনিশজন নেতা একসাথে দশ সেলে ছিলেন। মোট
কথা, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের দশ নম্বর সেল এদেশের রাজনীতির ইতিহাসের
এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, কালের নিরব স্বাক্ষী। সময়ের বিবর্তনে মান হরালেও
পরিবর্তনের এই স্রোতধারায় দশ সেল কালে কালে অনেক ক্ষণজন্মা
মহাপুরুষদের বুকে ধারণের ইতিহাসকে পুঁজি করে এখনো মাথা উচু করে
দাড়িয়ে আছে।
ছয়: খাতা—বারোয়ারি মানুষের জঘন্য মিলনমেলা
পুরান ঢাকা না দেখলে যেমন ঢাকা দেখা হয় না, কোলকাতা না দেখলে যেমন ভারতবর্ষ দেখা হয় না, তেমনি খাতায় (খাদা) না থাকলে জেল খেটেছি বলা চলে না। বিশ্বয়কর এ জগৎ ভাবনার অতীত। মূনুষ্যকুলের এহেন ভাবশক্তি নেই যে, মনে মনে খাতার একটি কল্পনাচিত্র তৈরী করে নিতে পারে। লম্বা হল ঘরের ন্যায় একাধিক ফ্লোরবিশিষ্ট ভবনগুলোকে বলে খাতা। সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে তৈরী খাতা ভবনগুলোর বড়ই করুণ হাল। পড়পড় অবস্থা। সিঁড়িতে হাঁটাচলা করলে পুরো ভবনই কেঁপে উঠে। ঢাকা কারাগারে খাতার সংখ্যা পাঁচটি। প্রত্যেকটিতে লোকসংখ্যা এক হাজারের উপর। সাধারণ গড়পড়তা বন্দীদের রাখা হয় খাতা এলাকায়। খাতা, বারোয়ারি মানুষের এক জঘন্য মিলনমেলা। সবকিছু এলোমেলো, নোংরা, অস্বাস্থ্যকর, জীর্ণ, অপরিপক্ক, দুঃখ-দুদর্শা ও দুষ্কর্মে ভরা। সম্ভবপর সকল প্রকার বীভৎস উৎপাত এখানে আসন গেড়েছে। যাদের হাতে ধন আছে, তাদের ধনগরিমার ইতরতা এবং সেই ধনের পিছে রোগতপ্ত, অভুক্ত, হতভাগ্য
