জেলখানার দিনগুলি

« <
/ 81
> »

না। জেলখানার এটাই নিয়ম। কি আর করা। তালাবদ্ধ আলোকিত ঘরে বসে লোহার গরাদ ধরে উদাস নয়নে সামনের বাগানের দিতে তাকিয়ে থাকা আর অন্তহীন ভাবনা-

“সময় তুমি বৃদ্ধ যাযাবর”

হাজারো বিধি-নিষেধের মধ্যে বন্দীদের রান্নার আসর অনেকটা রূপকথার মতো। পাঠক ভাববেন, কোথায় পাবে চুল্লী, কোথায় পাবে জ্বালানী, কোথা হতেই বা এলো হাঁড়ি-পাতিল। অথচ কি বিচিত্র এ আয়োজন। নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করাই কষ্ট হতো। রান্নার এই আয়োজনকে জ্বালানী সভ্যতার আদিম স্তরের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। দুটি ইট পাশাপাশি রেখে মাঝখানে একটি কন্ডেন্স মিল্ক-এর খালি কৌটা বসিয়ে দিলেই হয়ে গেল চুল্লী। ইট পাওয়া না গেলে অলিভ অয়েলের খালি কৌটা ইটের বিকল্প হিসাবে ভাল কাজ দেয়। জেল কর্তৃপক্ষের দেওয়া অ্যালুমিনিয়ামের সাল্কী সাইজের থালা ব্যবহৃত হয় হাঁড়ি-পাতিল হিসাবে। জ্বালানী হিসাবে ব্যবহৃত হয় মোমবাতি ও পুরানো কাপড়ের ন্যাকড়া। ইঞ্চি দুই পাশ ও একহাত লম্বা টুকরা কাপড়ের উপর মোমের গুঁড়া বিছিয়ে মুড়িয়ে গুল্টি বানালেই হলো। গুল্টির গায়ে সরিষার তেল মেখে কৌটায় ফেলে আগুন দিলেই চুল্লী জ্বলতে শুরু করে। মোমের উপর প্রশাসনের নজরদারী একটু বেশি। মোম না থাকলে বিকল্প জ্বালানী হিসাবে ব্যবহৃত হয় মিনারেল ওয়াটারের খালি বোতল, পলিথিন ব্যাগ, শাম্পুর কৌটা, পুরানো টুথব্রাশ ইত্যাদি। সবচেয়ে ভাল জ্বলে প্লাস্টিকের বদনা ও কনটেইনার। যে কারণে সেল এলাকায় বদনা খুব যত্ন করে রাখতে হয়। না হলে লকআপ খুললেই গালাগালির শব্দ-“কোন শালায় আমার বদনা খাইলরে?” লকআপের আগে যদি কেউ বাইরে কাপড় ছেড়ে আসেন তবে সকাল হতেই ওটাও খাওয়া শেষ। কোন জ্বালানীই যখন না থাকে তখন শুরু হয় বাগানের ফুল গাছের বাঁশের কঞ্চির ঠেকনা খাওয়া। জ্বালানীর প্রধান সরবরাহকারী হলো জেলখানার সুইপাররা। দামও সস্তা, পাঁচ-দশ টাকার বেশি নয়।

জেলখানার সম্বল, থালা-বাটি-কম্বল। কথাটি হাড়ে হাড়ে সত্য। এর বেশি কোন একটি জিনিসও সরবরাহ করা হয় না। অথচ জীবনযাপনের জন্য কত জিনিসেরই না প্রয়োজন হয়। জেলে চাকু, ছুরি কঠিনভাবে নিষিদ্ধ। তাই বলে কাটা ছেঁড়ার কাজ থেমে থাকে না। কয়েলের স্ট্যান্ডকে সিমেন্টে ঘষে ধারালো করে ছুরি হিসাবে পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়। জেলের ভাষায় বলে কাটনি। কোকের খালি ক্যান ব্যবহৃত হয় পানি খাওয়ার গ্লাস হিসাবে। জগের ঢাকনা ও ফ্লাস্কের মুখা ছিল আমাদের চায়ের কাপ। লেখালেখির কাগজের সংকট

« <
/ 81
> »