জেলখানার দিনগুলি

« <
/ 81
> »

তারপর বিশ-তিরিশ মিনিট ব্যায়াম, প্রাতঃকৃত্য, স্নান, আটটায় প্রাতঃরাশ। এরপর ঘণ্টা দুই উদ্দেশ্যহীন হাঁটা-চলা। বিরামহীন তাসের আড্ডা। দুপুর বারোটায় আসে দৈনিক পত্রিকা। ইচ্ছা করলেই মনের মতো পত্রিকা পড়ার উপায় জেলখানায় নেই। জেল সুপারের অনুমতি সাপেক্ষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিত তালিকা থেকে পছন্দসই যে কোন একটি পত্রিকা আপনি বেছে নিতে পারেন। সোজা কথায় যাকে বলা হয় প্রো-গভর্নমেন্ট পত্রিকা। আওয়ামী সরকারের আমলে জেলখানায় অনুমোদিত খবরের কাগজের তালিকায় ছিল- ইত্তেফাক, সংবাদ, জনকণ্ঠ এবং অবজারভার। তবে পত্রিকা পড়ার খরচ বহন করতে হয় বন্দীদের পার্সোনাল একাউন্ট থেকে। দুপুর একটার সময় আহার ও কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম। আবার দিনের দ্বিতীয় দফা তাসের আসর। এরই ফাঁকে বই পড়া, লেখালেখি করা। চারটায় শুরু হয় বৈকালিক হাঁটা-চলা। সচল দেহ অলসতায় যাতে অচল না হয়ে পড়ে তার জন্য সকাল-সন্ধ্যা হাঁটা-চলার দাওয়াইটি সকলেই কমবেশি গ্রহণ করে নিয়েছে। বিকাল পাঁচটায় লকআপ। বারো ঘণ্টার জন্য তালা বন্ধ। সন্ধ্যায় আযানের সাথে সাথেই চুল্লী জ্বলে উঠে। শুরু হয় ইনস্ট্যান্ট নুডুল্স ও চায়ের আয়োজন। এরপর বিরতিহীন তাসের মেলা বসে রাত দশটা অবধি। তাস খেলাও যে জীবনের ধরাবাঁধা অংশ হয়ে উঠতে পারে, জেলখানায় না আসলে তা অনুমান করা যেত না। ফাঁকে স্বল্প বিরতিতে কান লাগাই বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা অনুষ্ঠানে। রাত দশটায় দ্বিতীয় দফা চুল্লী যজ্ঞ। এরপর তালাবদ্ধ ঘরে বসে রাত পোহাবার অপেক্ষায় থাকা।

জেলখানার রাত। এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। বিকেল পাঁচটায় লকআপ। খোলা হয় সকালের গুনতি মেলার পর। গুনতি না মিললে শুরু হয় অন্তহীন প্রতীক্ষার প্রহর। ভাবতেও অবাক লাগে, খোদার দেয়া চব্বিশ ঘন্টার এই দিনে বারো ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তালাবন্দী জীবন কাটিয়েছি। রাতের সৌন্দর্য অবলোকনেরও যে খায়েশ জন্ম নিতে পারে, আকাশ দেখারও যে অহেতুক ইচ্ছার উদ্রেক হতে পারে জেলখানায় না আসলে বোধ হয় তা বোধগম্য হত না। সকালবেলা লকআপ খোলার সাথে সাথেই নীড় ছেড়ে যাওয়া ভোরের পাখিদের কলরবের মতো কিচিরমিচির আওয়াজ। কার আগে কে বের হবে। সন্ধ্যা লকআপের পর ঘন্টায় ঘন্টায় মিয়াসাহেবদের জিজ্ঞাসা-আপনারা কয়জন, অহেতুক বিরক্তির সৃষ্টি করে। সার্বিক দৃশ্যটি অনেকটা চিড়িয়াখানার খাঁচাবন্দী প্রাণীর মতো। বন্ধ ঘরের অন্ধকারে ঘুমিয়ে নেব, সে উপায় নেই। কারণ, বাতি জ্বলে সারা রাত ধরে। হাতের কাছে বিজলী বাতির সুইচ থাকলেও নেভানো যাবে

« <
/ 81
> »