কেইস টেবিলের দায়িত্বে নিয়োজিত কয়েদিদের বলে রাইটার। রাইটার শব্দের মানে করা দুষ্কর। তবে অক্ষর জ্ঞান অত্যাবশ্যক এমন কাজের দায়িত্বে থাকা কয়েদিদের রাইটার বলা যেতে পারে। চেহারা দেখে মনে হলো-ওদেরকে ওখানে দায়িত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার পাশাপাশি সৌন্দর্যের বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়েছে। ওখানেই দেখা হলো জেলের চীফ রাইটার আনিসের সাথে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। আমার এলাকায় বাড়ি। সাবেক ছাত্রনেতা। এক নজর দেখেই বোঝা যায়-হাজারো কয়েদিদের মধ্যে থেকে চীফ রাইটার হওয়ার মতো ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ওর আছে। ভীষণভাবে কো-অপারেটিভ। শ্রেণীভেদ জ্ঞান আছে। দক্ষিণা প্রাপ্তির প্রত্যাশায় আত্মসম্মানবোধকে এখনো পুরোপুরি বিসর্জন দেয়নি। নিশ্চিত করে বলতে পারি, সেদিন আনিস না থাকলে চোর-বাটপাড়দের একই সারিতে বসে, বাটি ছাঁটের পাল্লায় পড়ে সাধের কেশগুচ্ছকে বিসর্জন দিতে হতো। সইতে হতো নানা লাঞ্চনা। কামনা করি, ওর মঙ্গল হোক।
কেইস টেবিল নিয়ন্ত্রিত পিসি’র দোকান বসে শুক্রবার। দশ টাকার মাল পনের টাকা। শুধুমাত্র সওদা করার নিমিত্তে ভিজিটরস কাউন্টারে কুস্তি লড়ার চেয়ে বিশ-ত্রিশ পারসেন্ট চড়া দামের বাজারও ভাল। পিসির রাইটারও আমার এলাকার। নাম তোফা। সাত বছরের সাজা। মাসখানেক হলো জেলে এসেছে। ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন বহুবার আমার হলে এসেছে, থেকেছে।
হাইকোর্টে আপিল করে বেরিয়ে যাওয়ার শতভাগ বিশ্বাস নিয়ে আনন্দ স্ফূর্তিতেই আছে। যেমনি সাহসী তেমনি রসিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহবন্দী ছেলেরা ওকে ডাকে লক্ষ্মী ভাই বলে। বসতে বললেই বলত-“আমাগো পায়ে পায়ে লক্ষ্মী, যত হাঁটুম, তত খাওন, তত ট্যাকা”। এই সরল কৌতুকবোধের মধ্য দিয়ে ছেলেটি যে কি অকাট্য সত্য প্রকাশ করেছে তা হয়তো সে নিজেও জানে না।
কেইস টেবিল লেখা সাইনবোর্ডটির সামনেই রয়েছে একটি টেবিল ও চেয়ার। টেবিলের উপর খান কতক রেজিস্ট্রার খাতা। পিছনে বিচার বৈঠক সাইনবোর্ড আঁটা নির্যাতন কক্ষ। নির্যাতন কক্ষের দেয়ালে সারিবদ্ধভাবে পুঁতা পেরেকে ঝুলানো রয়েছে অত্যাচারের যতোসব আদিম-আধুনিক যন্ত্রপাতি। চেয়ারের পিছনের দিকটায় দাঁড়িয়ে থাকেন ডেপুটি জেলার ও সুবেদার। সামনে সারিবদ্ধভাবে আমরা ফাইলের পাবলিক। “বন্দীগণ সাবধান!” শব্দগুলো শোনার সাথে সাথেই আমরা যেন একযোগে দাঁড়িয়ে লম্বা একটি সালাম ঠুকি-বারকয়েক সেই তালিম দেওয়া হলো। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে জেলার মহোদয় তশরিফ রাখলেন। আগে পিছে পাইক-পেয়াদা, ডাইনে-বাঁয়ে আরদালি- বরকন্দাজ। পিছনে দাঁড়িয়ে একজন চাপরাসি বিরামহীনভাবে বাদশাহী পাখার রশি টেনে টেনে বিলাতি সাম্রাজের শেষ আনুগত্য প্রদর্শন করে যাচ্ছে। শুরু হলো নতুন আসামীদের ওয়ার্ড পাস। সীট বণ্টন ব্যবস্থায়
