জেলখানার দিনগুলি

« <
/ 81
> »

সংক্রমিত হলো। আলাপচারিতায় জেনেছি, বিল্লা ও নসু সদরঘাট টার্মিনালে নেমে হেঁটে হেঁটে মগবাজার যাচ্ছিল। পল্টন মোড়ে বি.এন.পি ও আওয়ামী লীগের মিছিলের মুখোমুখি সংঘর্ষ দেখে আশ্রয় নিয়েছিল মুক্তাঙ্গনে, পুলিশ ভ্যানের পাশে। হাঙ্গামা থামতেই পুলিশ ক্ষিপ্র গতিতে ওদের ভ্যানে তুলে নিল এবং ব্যাপক তৎপরতার সাথে ওয়ারলেস করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়ে দিল, “স্যার এক্কেবারে হাতে-নাতে দুইজন ধরেছি”। মনির মৌচাকের ঘড়ির দোকানের কর্মচারী। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে হরতালের মিছিল দেখছিল। হঠাৎ একটি পুলিশ ভ্যান ওর পাশে এসে থামল। মনিরকে গ্রেফতার করা হয়েছে মোড়ে কিছুক্ষণ আগে বিকট শব্দে বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে সেই অপরাধে। সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানের পুকুরে গোসল করছিল চারজন নির্মাণ শ্রমিক। ওদেরকে পুকুর থেকে তুলে শাহবাগে বোমা নিক্ষেপের মামলার আসামী করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষের জের হিসাবে আধ ঘণ্টা পর শাহবাগের মানিক নামের ছেলেটিকে ধরা হয়েছে আর্ট ইনস্টিটিউটের সামনে থেকে। এই গ্রেফতার যে অপরাধ দমনে পুলিশের পারঙ্গমতা প্রকাশের জন্য নয়, তা আর কারও বুঝতে বাকি রইল না। পরের দিন পত্রিকায় নিউজ হতে পারে এই ভেবে ঘটনাস্থল-ওয়ারী এই গ্রেফতারী আত্ম-প্রবঞ্চণা পুলিশের নষ্ট মানসিকতাকেই প্রকাশ করে। আন্দাজের উপর এ জাতীয় গণগ্রেফতার মূলতঃ দলীয় রাজনৈতিক কর্মসূচীকে সামনে রেখে হয়ে থাকে। এদের প্রায় সকলকেই পাঁচানী মামলায় চালান করা হয়। এতে পুলিশের কার্যসিদ্ধি হয়; বন্দীদেরও অল্পেতে মুক্তি মিলে। কাজের কাজ হয় না কিছুই।

আমদানির বারান্দায় পশ্চিম প্রান্তে লেখা রয়েছে ‘কেইস টেবিল’। কেইস টেবিল হলো জেলখানার অভ্যন্তরীণ নিয়ম-শৃঙ্খলা রক্ষার উদ্দেশ্যে গঠিত বিচারের এজলাস। তবে আয়োজনটা মোঘল সম্রাটদের দরবারে মজলিস স্টাইলের। মারামারি, অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, নিষিদ্ধদ্রব্য বহনসহ জেলকোড ভংগের অপরাধ থাকলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে putup করা হয় কেইস টেবিলে। জেলের ভাষায়, ‘কেস্টো ফাইল’ অথবা ‘কেস্টা ফাইল।’ পার্শ্বের দেয়ালে কালো রঙের টিনের প্লেটে সাদা কালিতে লেখা রয়েছে-“জেলখানায় কেউ টাকা-পয়সা লেনদেন করবেন না।” ভাগ্য ভালো, ঐ লেখাটি পয়লা দিন আমার নজরে পড়েনি। ওদের ঐ লেখাটি মেনে চলতে গেলে কত দুর্ভোগই না আমাকে পোহাতে হতো। কি নির্মম পরিহাস। সিগারেটের বিজ্ঞাপনের সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ নোটিশের মতো ওদের লেখার কাজ ওরা লিখে রেখেছে। এতে আরাম-আয়েশে থাকবার জন্য ঘুষ দেয়া-নেয়ার কমতি হচ্ছে বলে মনে হলো না। বলা যায়, নিয়মের বিধান রক্ষার এই টেবিলটিই জেলখানার সকল অনিয়মের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

« <
/ 81
> »