সোনার চেইনটা ওদের পরিতৃপ্ত করেছে বোঝা গেল। অন্ততঃ ওদের আয়েশী গঞ্জিকা সেবনের দৃশ্য দেখে তাই মনে হচ্ছিল।
রাত চারটা। ঘুমের ঘোরে শুনতে পেলাম-“ফাইল, ফাইল”। ভাবলাম একটু পরে উঠব। মাইরের ডরে সাহস হলো না। বাথরুমের দিকে যারা যাচ্ছিল, তাদেরকে ভেড়ার পালের মতো লাঠিপেটা করে ফাইলে বসানো হলো। প্রকৃতির ডাককে উপেক্ষা করে অনেক কষ্টে ফাইলে বসলাম। গুনতি শেষে বারান্দায় দাঁড়িয়েছি মাত্র। আবার শ্রুতিকটু বাক্য-“ফাইল, ফাইল”। শুরু হলো বাধ্যতামূলক চুল ছাঁটাই পর্ব। সেও এক মজার ব্যাপার। ত্বরিৎকর্মা নাপিত। লাইনের শেষ প্রান্ত থেকে কাঁচি চালাতে চালাতে চক্ষের নিমিষে পৌঁছে গেল পয়লা প্রান্তে। চুল কাটা শেষ। ইতর-ভদ্র, ফকির-বাদশাহ সকলের জন্য একই স্টাইল, একই ডিজাইন-বাটি ছাঁট। শৈশবে গ্রামের বাড়ীতে গাছ-তলায় বসে চুল ছাঁটাইয়ের সময় বুদ্ধ নাপিতের বাটি ছাঁট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বাবার দৃষ্টির আড়ালে বুদ্ধ চাচাকে কতো অনুনয়-বিনয়ই না করেছি। মাল ঢাললে এবড়ো থেবড়ো চুল কেটে নেয়ার অত্যাচার থেকে রেহাই পাওয়ার ব্যবস্থা এখানেও আছে। তবে জেলখানায় দাক্ষিণ্যের স্থান না থাকলেও দক্ষিণার প্রভাব প্রকট। অবশ্য বলতে দ্বিধা নেই ফাইলিং এর সময় প্রতিবার লাইনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থেকে আত্মসম্মান রক্ষার ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছিলাম।
অকারণে কেউ জেল খাটুক, এমনটা কামনা করি না। তবে জেলখানায় আসার সম্ভাবনা যাদের আছে, তাদের আমদানি সম্পর্কে জ্ঞান থাকা ভাল। এত কথা বলার উদ্দেশ্যে একটাই, জেলে আসতে, গেইটের ভেতর পা রাখার আগেই ইলিশ ফাইলের কথা ভেবে গোটা কয়েক সিগারেটের প্যাকেট সাথে আনতে কেউ যেন ভুল না করেন। কারণ, সিগারেটকে বলা হয় জেল কারেন্সি। জেলে হেন কাজ নেই যা সিগারেটে হয় না। তবে, কথা কি জানেন, আমার দ্বিতীয় কারাবাসের সময় ঐ একই ভুল আমার আবারও হয়েছে। থানা হাজত ও কোর্ট গারদের দুর্বিসহ সময়ে জেলখানার আগাম দুর্গতির কথা ভেবে সিগারেটের যোগান রাখার ভাবনার সুযোগই বা কোথায়।
চার: পাচাঁনীদের দুর্গতি ও কেইস টেবিল সমাচার
আমদানির সামনে শান-বাঁধানো জায়গায় ফাইল করে, কিশোর বন্দী ও পাঁচানী মামলার আসামীদের আলাদাকরণ প্রক্রিয়াটি বড়ই অদ্ভুত। তখন মাঝরাত, বিজলী বাতির অপর্যাপ্ত আলো। মিয়াসাহেবরা (জেল সিপাই) ঘুরে ঘুরে সাইজে ছোট আসামীদের বাছাই করে আলাদা করছে। সিআইডি মিয়াসাহেব বাছাইকৃত ছেলেদের নাকের ডগার নিচে আঙুল চালনা করে দাড়ি-গোঁফের অস্তিত্ব অনুসারে মেন্টালে না স্কুলে পাঠানো হবে
