আদম আলাইহিস সালাম: সৃষ্টির আদি কথা

« <
/ 40
> »

ফেরেশতাদের প্রতি সিজদাহর নির্দেশ
আদম (আ.) এখন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর দীর্ঘকায় দেহ থেকে এক অপার্থিব নূর বিচ্ছুরিত হচ্ছে। জান্নাতের সুউচ্চ তোরণ আর নূরের পরিবেশ এক অভাবনীয় গাম্ভীর্যে ভরে উঠল। মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় সৃষ্টিকে সম্মানিত করার চূড়ান্ত পর্যায়টি এবার কার্যকর করলেন।

মহাকাশ ও আরশের সমস্ত নিস্তব্ধতা ভেঙে আল্লাহর বজ্রকণ্ঠের সেই অলঙ্ঘনীয় নির্দেশ ধ্বনিত হলো—যা ছিল একই সাথে আনুগত্যের পরীক্ষা এবং আদমের শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা:

“আর স্মরণ করো, যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, ‘তোমরা আদমের প্রতি সিজদাবনত হও’।” [সূরাহ আল-বাক্বারাহ: ৩৪]

এই সিজদাহ ইবাদতের জন্য ছিল না, কারণ ইবাদত একমাত্র আল্লাহর প্রাপ্য। এই সিজদাহ ছিল ‘সম্মানসূচক’ (সিজদাহয়ে তাহিয়্যাহ), যা মূলত আদমের ভেতরে থাকা ঐশী রূহ এবং আল্লাহর মহাপরিকল্পনার প্রতি কুর্নিশ জানানো।

এক মুহূর্তের দেরি হলো না। আল্লাহর এই নির্দেশ শোনার সাথে সাথে আকাশ-পাতাল জুড়ে কোটি কোটি ফেরেশতা—যাঁরা নূরের তৈরি, যাঁদের কোনো অহংকার নেই—তাঁরা ঝড়ের বেগে সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন। সেই দৃশ্যে যেন পুরো মহাবিশ্ব একাকার হয়ে গেল। নূরের শুভ্র ডানার প্রান্তগুলো জান্নাতের মেঝেকে স্পর্শ করল। জিবরাঈল (আ.), মীকাঈল (আ.)-এর মতো বিশাল ফেরেশতা থেকে শুরু করে জান্নাতের প্রতিটি প্রহরী ফেরেশতা তখন অবনত মস্তকে আদম (আ.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নিলেন।

ফেরেশতাদের সিজদাবনত হওয়ার সেই দৃশ্যটি ছিল মহাবিশ্বের প্রথম শৃঙ্খল ও আনুগত্যের এক অনন্য প্রতীক। আদম (আ.) বিস্ময় ও বিনয় নিয়ে দেখলেন, আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতারা তাঁকে সম্মান জানাচ্ছেন।

কিন্তু সেই বিশাল নূরাণী ভিড়ের মাঝে একজন তখনো পাথরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার কপালে সিজদাহর কোনো চিহ্ন নেই, চোখে কোনো বিনয় নেই। বরং তার চোখের কোণে ঠিকরে বের হচ্ছিল আগুনের ফুলকি আর চরম অবজ্ঞার ছাপ। সে ইবলীস। কোটি ফেরেশতা যখন সিজদাহর সাগরে ডুবে আছে, ইবলীস তখন তার কুটিল ও দীর্ঘ ছায়া নিয়ে দণ্ডায়মান।

মহাবিশ্বের ইতিহাসের প্রথম প্রকাশ্য বিদ্রোহের দৃশ্যটি তখন জান্নাতের সেই পবিত্র আঙিনায় রচিত হতে যাচ্ছিল। আল্লাহর নির্দেশের চেয়ে তার কাছে বড় হয়ে উঠল নিজের ‘আমি’।

« <
/ 40
> »