ইবলীসের অবাধ্যতা, অহংকার ও অভিশপ্ত হওয়ার কারণ
জান্নাতের সেই পরিবেশ তখন থমথমে। ফেরেশতারা সিজদাহ থেকে মাথা তুললেন, কিন্তু দেখলেন ইবলীস আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে। আল্লাহ সব জানতেন, তবুও অপরাধীকে অপরাধ স্বীকার করার এবং তার যুক্তির অসারতা প্রমাণের সুযোগ দেওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করলেন:
“‘হে ইবলীস! আমি যাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছি, তার প্রতি সিজদাবনত হতে তোমাকে কিসে বাধা দিল? তুমি কি অহংকার করলে, নাকি তুমি উচ্চমর্যাদাবানদের অন্তর্ভুক্ত?’” [সূরাহ সোয়াদ: ৭৫]
ইবলীস তখন তার ভেতরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের বিষ উগড়ে দিল। সে আল্লাহর প্রজ্ঞার চেয়ে নিজের সীমিত যুক্তিকে প্রাধান্য দিল। সে উদ্ধত গলায় উত্তর দিল:
“আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ; আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে।” [সূরাহ আল-আ‘রাফ: ১২]
ইবলীসের যুক্তি ছিল—আগুন ঊর্ধ্বগামী আর মাটি নিম্নগামী; আগুন তেজোময় আর মাটি অন্ধকার। তার এই তুলনামূলক যুক্তিটি ছিল ভ্রান্ত। কারণ সে দেখেনি মাটির ভেতরের উর্বরতা আর নমনীয়তা, যা দিয়ে গড়ে ওঠে জীবনের বাগান। সে কেবল বাহ্যিক উৎস দেখে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের বড়াই করল।
আল্লাহর এই স্পষ্ট নির্দেশ অমান্য করা এবং তাঁর সৃজনশীলতাকে চ্যালেঞ্জ করার কারণে ইবলীস তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর রহমত থেকে বিতাড়িত হলো। মহান আল্লাহ ঘোষণা করলেন:
“তিনি বললেন, ‘তবে তুমি এখান থেকে বেরিয়ে যাও, নিশ্চয়ই তুমি অভিশপ্ত। আর বিচার দিবস পর্যন্ত তোমার ওপর রইল আমার অভিশাপ’।” [সূরাহ সোয়াদ: ৭৭-৭৮]
ইবলীস তার ভুলের জন্য তওবা করল না, বরং সে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করল কিয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকার জন্য। আর সেই দীর্ঘ জীবনে সে মানুষের পরম শত্রু হওয়ার শপথ নিল। সে বলল, সে মানুষের ডানে, বামে, সামনে এবং পেছন থেকে আক্রমণ করবে যাতে অধিকাংশ মানুষ অকৃতজ্ঞ হয়ে যায়।
একদিকে আদম (আ.) যখন সম্মানের শিখরে আরোহণ করলেন, অন্যদিকে ইবলীস তার অহংকারের কারণে চিরদিনের জন্য অন্ধকারের অতলে তলিয়ে গেল। জান্নাতের শান্ত চত্বরে শুরু হলো এক নতুন দ্বৈরথ—আদমের সরলতা বনাম ইবলীসের ধূর্ততা।
