আদম আলাইহিস সালাম: সৃষ্টির আদি কথা

« <
/ 40
> »

আদম (আ.)-কে বিশেষ জ্ঞান ও নামসমূহ শিক্ষা দান
ইবলীসের পতনের পর জান্নাতের পরিবেশে এক ধরণের গাম্ভীর্য নেমে এল। ফেরেশতারা যদিও আল্লাহর নির্দেশে সিজদাহ করেছিলেন, কিন্তু তাঁদের মনে হয়তো একটি সূক্ষ্ম কৌতূহল তখনো রয়ে গিয়েছিল—মাটির এই নতুন সত্তা কেবল কি সম্মানের যোগ্য, নাকি যোগ্যতায়ও শ্রেষ্ঠ? মহান আল্লাহ চাইলেন ফেরেশতাদের সামনে আদম (আ.)-এর সেই অন্তর্নিহিত জ্ঞানতাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করতে।

আল্লাহ তা‘আলা আদম (আ.)-কে এক অলৌকিক উপায়ে মহাবিশ্বের সমস্ত কিছুর ‘নাম’ এবং তাদের গুণাগুণ শিক্ষা দিলেন। এটি কোনো সাধারণ মুখস্থ বিদ্যা ছিল না, বরং এটি ছিল প্রতিটি বস্তুর সারকথা ও উপযোগিতা বোঝার মতো এক বিশেষ প্রজ্ঞা। আকাশ, পৃথিবী, পাহাড়, নদী, বৃক্ষলতা থেকে শুরু করে এমনকি অনাগত ভবিষ্যতে মানুষের আবিষ্কৃত হতে যাওয়া ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুর জ্ঞানও তাঁর হৃদয়ে গেঁথে দেওয়া হলো।

অতঃপর আল্লাহ সেই বস্তুগুলো ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন। এক বিশাল পরীক্ষার আয়োজন করা হলো আরশের আঙিনায়। আল্লাহ ফেরেশতাদের সম্বোধন করে বললেন:

“তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তবে এই বস্তুগুলোর নাম আমাকে বলে দাও।” [সূরাহ আল-বাক্বারাহ: ৩১]

ফেরেশতারা বিস্ময়ভরে সেই বস্তুগুলোর দিকে তাকালেন। তাঁদের কাছে কেবল সেই জ্ঞানই ছিল যা আল্লাহ তাঁদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের জন্য দিয়েছিলেন। সৃষ্টিজগতের এই বিচিত্র ও গভীর জ্ঞান তাঁদের নূরাণী বুদ্ধির বাইরে ছিল। তাঁরা অত্যন্ত বিনয় ও সসংকোচে নিজেদের অপারগতা স্বীকার করে নিলেন। তাঁদের উত্তরটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম বিনয়াবনত স্বীকারোক্তি:

“তারা বলল, ‘আপনি অত্যন্ত পবিত্র! আপনি আমাদের যা শিক্ষা দিয়েছেন, তা ছাড়া আমাদের তো কোনো জ্ঞান নেই। নিশ্চয়ই আপনি মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়’।” [সূরাহ আল-বাক্বারাহ: ৩২]

এবার এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আল্লাহ আদম (আ.)-কে নির্দেশ দিলেন, “হে আদম, তুমি তাদের এসবের নাম বলে দাও।”

আদম (আ.) একে একে প্রতিটি বস্তুর নাম, তাদের পরিচয় এবং রহস্য ফেরেশতাদের সামনে সাবলীলভাবে বর্ণনা করতে শুরু করলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর জান্নাতের বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। ফেরেশতারা স্তব্ধ হয়ে শুনছিলেন মাটির তৈরি এক মানুষের মুখ থেকে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের সেই ঝরনাধারা। যখন বর্ণনা শেষ হলো, আল্লাহ ফেরেশতাদের লক্ষ্য করে বললেন:

“আমি কি তোমাদের বলিনি যে, নিশ্চয়ই আমি আসমান ও যমীনের অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে জানি এবং তোমরা যা প্রকাশ করো ও যা গোপন করতে, তাও আমি জানি?” [সূরাহ আল-বাক্বারাহ: ৩৩]

ফেরেশতারা বুঝতে পারলেন, আদম (আ.) কেবল একটি অবয়ব নন, বরং তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারের ধারক। তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তাঁর সৃষ্টিতে নয়, বরং তাঁর ‘ইলম’ বা জ্ঞানের গভীরতায়। জ্ঞানের এই আলো দিয়েই তিনি অন্ধকারকে জয় করবেন এবং পৃথিবীতে আল্লাহর খিলাফতের দায়িত্ব পালন করবেন।

একদিকে ইবলীস তার ‘আগুনের শ্রেষ্ঠত্ব’ নিয়ে পড়ে রইল, অন্যদিকে আদম (আ.) তাঁর ‘জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব’ দিয়ে ফেরেশতাদেরও বিস্ময়াভিভূত করলেন। এভাবেই শুরু হলো মানবজাতির জ্ঞানতাত্ত্বিক জয়যাত্রা।

« <
/ 40
> »