আদম আলাইহিস সালাম: সৃষ্টির আদি কথা

« <
/ 40
> »

ফেরেশতাদের সংশয় ও মহাপ্রভুর প্রজ্ঞাপূর্ণ উত্তর
নূরের জগত এক অদ্ভুত চাঞ্চল্যে থমকে দাঁড়িয়েছে। আরশের চারপাশ থেকে ভেসে আসা তাসবীহ পাঠের ধ্বনি যেন এক মুহূর্তের জন্য কিছুটা ধীর হয়ে এল। মহান আল্লাহর সেই অমোঘ ঘোষণা— “আমি যা জানি, তোমরা তা জানো না”—ফেরেশতাদের হৃদয়ে এক গভীর ভাবনার উদ্রেক করল। তাঁরা বুঝতে পারলেন, এই নতুন সৃষ্টি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; বরং এটি খোদায়ী এক মহাপরিকল্পনার অংশ।

ফেরেশতারা যখন প্রশ্ন করেছিলেন— “আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে অশান্তি ঘটাবে?”—তাঁদের সামনে ছিল পৃথিবীতে ইতিপূর্বে বিচরণকারী জিনদের বিশৃঙ্খলার তিক্ত ইতিহাস। তাঁরা দেখেছিলেন কীভাবে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির অধীকারীরা স্রষ্টার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পারে। তাঁরা ভেবেছিলেন, ফেরেশতাদের মতো নিষ্কলুষ আনুগত্যই হয়তো সৃষ্টির পরম সার্থকতা।

কিন্তু মহাপ্রভু আল্লাহ তাঁর প্রজ্ঞার আলোকচ্ছটায় এক ভিন্ন সত্য ফুটিয়ে তুললেন। ফেরেশতারা কেবল বাহ্যিক রূপ আর অতীত অভিজ্ঞতা দেখছিলেন, কিন্তু আল্লাহ দেখছিলেন সেই ‘খলীফা’র ভেতরের লুক্কায়িত সম্ভাবনা।

আল্লাহর সেই উত্তরের নিহিত হিকমত ছিল গভীর। তিনি জানতেন:

ফেরেশতাদের কাছে প্রবৃত্তি নেই, তাই তাঁদের ইবাদত সহজাত। কিন্তু মানুষ ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ক্রোধ আর প্রলোভনের সাথে লড়াই করে যখন “সুবহানাল্লাহ” বলবে, তখন সেই শব্দের ওজন হবে আরশের ওজনসম।

মানুষ ভুল করবে, গুনাহ করবে; কিন্তু এরপর যখন তার দুচোখ বেয়ে অনুশোচনার অশ্রু ঝরবে, তখন সেই ‘তওবা’র দৃশ্য হবে মহাবিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য।

মানুষের মধ্যেই জন্ম নেবে আম্বিয়া-ই-কেরাম, আউলিয়া এবং সিদ্দীকগণ, যাঁরা ফেরেশতাদের চেয়েও উচ্চতর মাক্বামে আসীন হবেন।

আল্লাহর এই প্রজ্ঞাপূর্ণ উত্তর শোনার পর ফেরেশতাদের সমস্ত সংশয় কর্পূরের মতো উবে গেল। তাঁরা বুঝতে পারলেন, আনুগত্য কেবল পালনে নয়, বরং না বুঝে আল্লাহর ইচ্ছার সামনে সমর্পিত হওয়ার নামই হলো প্রকৃত ইবাদত। তাঁরা অবনত মস্তকে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নিলেন।

এই কথোপকথনের মাধ্যমে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠল যে, আদম (আ.) কেবল মাটির পুতুল নন, বরং তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান আমানতের ধারক। তাঁর মধ্যে একদিকে থাকবে পৃথিবীর মাটির টান, অন্যদিকে থাকবে আল্লাহর রূহের ঊর্ধ্বগামিতা।

একদিকে যখন আরশে এই তাত্ত্বিক মীমাংসা হচ্ছিল, অন্যদিকে তখন পৃথিবীর আনাচে-কানাচে থেকে মাটি সংগ্রহের এক মহোৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। কারণ, খলীফার অবয়ব তৈরির জন্য প্রয়োজন ছিল জমিনের শ্রেষ্ঠ উপাদান।

« <
/ 40
> »