আদম (আ.)-এর অবয়ব গঠনে ব্যবহৃত মাটির উৎস ও বৈচিত্র্য
আরশের অধিপতির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার পর শুরু হলো সেই ঐতিহাসিক মহোৎসব—আদমের দেহকাঠামো নির্মাণের উপকরণ সংগ্রহের পালা। কিন্তু এই মাটি যে কোনো সাধারণ মাটি হবে না। কারণ, এই দেহ থেকে যে বংশধররা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে, তাদের মধ্যে থাকবে বৈচিত্র্য, ভিন্নতা এবং বহুমুখী স্বভাব।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এই রহস্য উন্মোচন করে বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা আদমকে সৃষ্টি করেছেন এক মুষ্টি মাটি থেকে, যা সমগ্র পৃথিবী থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। তাই আদমের সন্তানেরা মাটির রঙ ও প্রকৃতির বৈচিত্র্য অনুযায়ী পৃথিবীতে এসেছে। তাদের কেউ লাল, কেউ সাদা, কেউ কালো, আর কেউ এগুলোর মাঝামাঝি। কেউ কোমল স্বভাবের, কেউ কঠোর, কেউ পাপাচারী, আবার কেউ পুণ্যবান।” [সুনানে তিরমিযী, হাদীস: ২৯৫৫; সুনান আবূ দাউদ, হাদীস: ৪৬৯৩]
আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতারা পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্ত থেকে মাটি সংগ্রহ করলেন। কোথাও থেকে আনা হলো ঊষর মরুভূমির তপ্ত বালুকা রাশি, কোথাও থেকে নদী বিধৌত উর্বর পলি, আবার কোথাও থেকে পাহাড়ের কঠিন কৃষ্ণমৃত্তিকা। কোনো মাটি ছিল নোনতা, কোনোটি ছিল মিষ্টি।
এই বৈচিত্র্যের উদ্দেশ্য ছিল গভীর। মানুষের দেহের এই বিচিত্র মাটির সংমিশ্রণই নির্ধারণ করে দিল যে, কোনো মানুষ হবে অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও নরম মনের, আবার কেউ হবে পাহাড়ের মতো অনড় ও কঠোর। কারও চামড়ার রঙ হবে বরফের মতো শুভ্র, কারও বা তপ্ত দুপুরের মতো তামাটে কিংবা নিশীথ রাতের মতো নিকষ কালো।
সংগৃহীত এই বিচিত্র মাটিকে এরপর পানি দিয়ে মথিত করা হলো। দীর্ঘ সময় ধরে এই কাদা মাটিকে রাখা হলো এক বিশেষ অবস্থায়। কুরআন মাজীদের বর্ণনায় এই বিবর্তনটি অত্যন্ত চমৎকার:
১. প্রথমে এটি ছিল ‘ত্বীন’ বা সাধারণ মাটি। ২. এরপর তা হয়ে উঠল ‘ত্বীনুন লাযিব’ বা আঠালো কাদা। [সূরাহ আস-সাফফাত: ১১] ৩. দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর তা রূপান্তরিত হলো ‘হামাইন মাসনূন’ বা কালো দুর্গন্ধযুক্ত পক্ব কর্দমে। [সূরাহ আল-হিজর: ২৮] ৪. সবশেষে তা শুকিয়ে রূপ নিল ‘সালসালিন কাল ফাখখার’ বা পোড়া মাটির মতো খটখটে শুকনো ঠনঠনে মাটিতে। [সূরাহ আর-রাহমান: ১৪]
এই যে দীর্ঘ বিবর্তন, এটি যেন মহাবিশ্বকে এক নীরব বার্তা দিচ্ছিল। শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হুট করে তৈরি হয় না, বরং তাকে ধৈর্য আর সময়ের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পূর্ণতা পেতে হয়। ফেরেশতারা বিস্ময়ভরে তাকিয়ে দেখলেন, মহান কারিগর আল্লাহ নিজ কুদরতি হাতে এক অপূর্ব অবয়ব তৈরি করছেন। মানুষের সেই সুষম দেহকাঠামো, সেই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিন্যাস—সবই ছিল এক অতুলনীয় নান্দনিকতার বহিঃপ্রকাশ।
সেই মাটির দেহটি তখনো প্রাণহীন। জান্নাতের দরজায় পড়ে থাকা এক বিশাল মূর্তি যেন। কিন্তু এই স্তব্ধতার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক মহাবিস্ফোরণের অপেক্ষা। কারণ, এই দেহে যখন খোদায়ী রূহ বা আত্মা প্রবেশ করবে, তখন সে হয়ে উঠবে সৃষ্টির মুকুট।
