খিলাফতের ঘোষণা: ফেরেশতাদের সাথে মহান আল্লাহর কথোপকথন
মহাকাশের নীলিমা আর পৃথিবীর সবুজ গালিচা তখনো এক অপার্থিব নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। নূরের তৈরি ফেরেশতারা নিরন্তর সিজদাহ আর তসবিহতে নিমগ্ন হয়ে আল্লাহর পবিত্রতা রক্ষা করছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে আরশের অধিপতি মহান আল্লাহ তাঁর এক বিস্ময়কর সিদ্ধান্তের কথা ফেরেশতাদের সামনে ব্যক্ত করলেন।
পবিত্র কুরআনের ভাষায় সেই ঘোষণাটি ছিল অত্যন্ত গম্ভীর এবং তাৎপর্যপূর্ণ:
“স্মরণ করো, যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদের বললেন, ‘নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি (খলীফা) সৃষ্টি করতে যাচ্ছি’।” [সূরাহ আল-বাক্বারাহ: ৩০]
এই ঘোষণা শুনে ফেরেশতা মহলে এক গভীর বিস্ময় ও কৌতূহলের সৃষ্টি হলো। তারা কোনো অবাধ্যতা থেকে নয়, বরং ইতিপূর্বে পৃথিবীতে বসবাসকারী ‘জিন’ জাতির রক্তপাত ও বিশৃঙ্খলার ইতিহাস স্মরণ করে বিনীতভাবে আরজ করলেন:
“আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যে অশান্তি ঘটাবে এবং রক্তপাত করবে? অথচ আমরাই তো আপনার সপ্রশংস পবিত্রতা ঘোষণা করি এবং আপনার মহিমা কীর্তন করি।” [সূরাহ আল-বাক্বারাহ: ৩০]
ফেরেশতাদের এই প্রশ্নের পেছনে কোনো অহংকার ছিল না। তারা কেবল এটাই বুঝতে চাচ্ছিলেন যে, যেখানে তারা রাত-দিন আল্লাহর ইবাদতে মশগুল, সেখানে মাটির তৈরি এবং আবেগ-তাড়িত কোনো সত্তাকে কেন প্রতিনিধি বানানো হচ্ছে? মানুষের মধ্যে যে কাম, ক্রোধ এবং লোভের মতো প্রবৃত্তি থাকবে, তা কি পৃথিবীকে অশান্ত করে তুলবে না?
ফেরেশতাদের সেই ব্যাকুল প্রশ্নের উত্তরে মহান আল্লাহ এক অমোঘ সত্য প্রকাশ করলেন। এমন এক সত্য, যা কেবল তাঁর অসীম প্রজ্ঞার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তিনি সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত শক্তিশালী কণ্ঠে উত্তর দিলেন:
“নিশ্চয়ই আমি যা জানি, তোমরা তা জানো না।” [সূরাহ আল-বাক্বারাহ: ৩০]
এক মুহূর্তের জন্য আরশের চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ফেরেশতারা বুঝতে পারলেন, এই নতুন সৃষ্টির পেছনে এমন এক মহান উদ্দেশ্য রয়েছে যা তাদের বুদ্ধির অগম্য। আল্লাহ কেবল এক অনুগত দাস সৃষ্টি করতে চাচ্ছেন না, বরং তিনি এমন এক সত্তা সৃষ্টি করতে চাচ্ছেন যে প্রবৃত্তি থাকা সত্ত্বেও স্বেচ্ছায় তার প্রভুকে ভালোবাসবে, যে ভুল করবে আবার তওবা করে তাঁর কাছেই ফিরে আসবে।
আল্লাহর এই রহস্যময় উত্তরের পর ফেরেশতারা মাথা নত করে নিলেন। শুরু হলো ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর সৃজনপ্রক্রিয়া। মহান আল্লাহ এবার নির্দেশ দিলেন পৃথিবীর মাটি সংগ্রহ করার জন্য। মাটির দেহ থেকে ‘ইনসান’ বা মানুষ তৈরির সেই মহাপ্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল।
পৃথিবীর ভাগ্যলিপি তখন এক নতুন বাঁক নেওয়ার অপেক্ষায়। জগতবাসী দেখার অপেক্ষায় ছিল সেই ‘খলীফা’কে, যার জন্য আসমান ও জমিনের সবকিছুকে অনুগত করে দেওয়া হবে।
