ইয়েমেনে একশত বিশদিন

« <
/ 114
> »

পাহাড়ী কন্যার দেশে আজকে আমাদের অবস্থানের শেষ দিন। কেমন যেন মায়া পড়ে গেছে। অটল গাম্ভির্য নিয়ে নিরব, নিঘর, নিশ্চুপ পাহাড় গুলো শব্দহীন ভাষায় কেমন করে যে এই অল্প কয়েকদিনেই আমাদের ভালবাসার বাঁধনে বেঁধে ফেলেছে তা আগে বুঝিনি। ছেড়ে যাবার আগে তাই বিভিন্ন পাহাড়ের মাথার উপরের বাড়ীঘর সহ ‘ভাল কিছু মনে রাখার মতো স্মৃতি’ পেতে মন চাইছিল। এ যেন চুলের কাঁটা ব্যাগে রেখে ভালবাসার জনকে মনে রাখার আন্তরিক অথচ অক্ষম প্রচেষ্টা। ছাবেত ভাইকে কথাটি বলতেই লাফিয়ে উঠে গাড়ী চালু করে বললেন, শিগগীর উঠে পড়ুন। সময় খুব কম। ‘এ যেন উঠ ছুড়ি তোর বিয়ে’ এর মত অবস্থা। ভাল করে কিছু বোঝার আগেই তরতর করে গাড়ী ছুটে চলল পাহাড়ী পথ দিয়ে। খুব পাকা ড্রাইভার। দীর্ঘ জীবন পাহাড়ী পথে গাড়ী চালিয়ে অভ্যন্ত। তাই কঠিন পথের বাঁকগুলোও অবলিলাক্রমে সাবলিলভাবে পার হচ্ছিলেন। তার এক ছেলে আহমদ আমাদের সঙ্গে আসছিল। বয়স মাত্র দশ বৎসর। সে এখনই বাড়ীর ট্রাক চালিয়ে অভ্যস্তই শুধু নয় বরং বেশিরভাগ সময় সেই-ই ট্রাক চালায়। ভাবতেই অবাক লাগে।
পাহাড়ের বন্ধুর পথ শেষ হতেই পাকা রাস্তা। বাঁয়ে চলে গেছে আদন অর্থাৎ এডেন বন্দরের দিকে আর ডানের রাস্তা গেছে কিরখাম এর চূড়া বুয়ারা এর দিকে। এই পাহাড়ের পাশাপাশি প্রায় সমান উঁচু দুইটা চূড়ার একটার উপর নাফরা টেলিফোন ও মোবাইল টাওয়ারসহ সুন্দর ছোট খাট একটা শহর। শহরে ঢোকার আগে পাকা রাস্তা শুরু হয়েছে। ঐখানে একটা বাঁক খুব কঠিন। ছাবেত ভাইও খুব ধীরে ধীরে মোড়টা পার হলেন। আমি গাড়ীর বাম দিকের জানালার ধারে বসে দেখলাম, ধার থেকে ছোট ছোট নুরী পাথর ঝুর ঝুর করে নিচের দিকে কিছুটা ঝড়ে পড়ল। এদেশে গাড়ী চলে রাস্তার ডানদিক দিয়ে। ফোর হুইল গাড়ী তবুও কেমন যেন শিহরণ খেলে গেল শরীরের ভেতরে।
পরিচ্ছন্ন শহর, ঢোকার মুখেই মস্তবড় ‘মাদ্রাসা খাওলা’ এবং তার দু’পাশে এবং কিছুটা উপরে বিভিন্ন কর্মচারী ও স্থানীয় মানুষদের বসবাস। শহরের নাম কুআইদিনা। ঢুকার মুখেই বাজার এবং তার বেশিরভাগ অংশেই জমজমাট কাদ বিক্রির ব্যবস্থা। তার পাশেই একটা কৃত্তিম পুকুর- নিচে ও চারপাশে পাকা করা গভীর একটা সুইমিং পুলের মতো। তলায় সামান্য পানি তবু সবাই আমাদের ওখানে ‘মুইয়া’ মানে পানি দেখাতে নিয়ে যেতে চায়। তাদের প্রাণহীন দেশে এটা একটা আশ্চর্য বস্তু। পাশের ছোট পাহাড়েই সব ধরনের অস্ত্র বিক্রির বাজার ‘খামিছ’। আমাদের দেশের যে কোন হাট বাজারে যেভাবে দা বটি ইত্যাদি বিক্রি হয় ঐ রকমই এই বাজারে এ কে-৪৭ সহ যে কোন অস্ত্র বিক্রি হয়। এদেশে কোন লাইসেন্স লাগে না। যে কেউ যে কোন অস্ত্র কিনতে পারে। অবশ্য ট্যাংক ও কামান বিক্রি হয় কিনা তা জানি না। সকাল থেকে এগার/বারটা পর্যন্ত বাজার চলে। আমাদের আসতে দুপুর গড়িয়ে যাওয়ায় বাজারটা দেখা হল না।

« <
/ 114
> »