নিজেরা গাড়ী ভাড়া করেছিলাম। কিন্তু সে ভাড়াও ওরা আমাদের দিতে দেননি। ড্রাইভারও তাদের দলে। এ এক আজব ভাল মানুষদের দেশের অনাস্বাদিত ও অপূর্ব ভালবাসার বন্যা। এ ঋণ আমরা কি শুধবার কথা ভাবতে পারি? তাই রহমানুর রাহিম আল্লাহর দরবারে এদের জন্য শুধু দু’হাত তুলি আর আফসোস করে বলি হায়! এ রকম গুণ কি আমাদের হতে পারে না?
মসজিদ-ই নূর এ আসার পূর্ব পর্যন্ত এদেশের ছেলেদের পানির ছোট বোতলের এক বোতল পানিতে অজু করতে দেখলে কেমন যেন কূপন বলে মনে হত। আমাদের এক সাথীর তো এক বদনা পানিতেও অজু শেষ হত না। পানির প্রয়োজন হলে কাউকে বললেই পানি চলে আসত। ফলে, মনে তেমন কোন প্রশ্ন জাগেনি। গাড়ীতে আসার সময় পথের ধারে মাঝে মধ্যেই কুয়া চোখে পড়ত। কুয়াকে এরা বলে ‘বীর’ যেমন বীরে মাউন। সব সময়ই এসব কুয়ার ধারে গাধা নিয়ে মেয়েদের পানি নিতে দেখতাম। কোন কোন কুয়ায় অবশ্য একটা কপিকল থাকলেও কুয়ার চারধারে দাঁড়িয়ে মেয়েরা নিজের দড়ি ও ছোট কন্টেনার দিয়ে পানি তুলত। এটাই এখানে স্বাভাবিক মনে হত। মসজিদ-ই নূরের সামনেই একটা কুয়া আছে। দূরত্ব পঞ্চাশ/ষাট হাত হবে হয়ত। তিনদিকে গাছ গাছালীতে প্রায় ঢাকা। ঐ দিন ভোর বেলায় ফজরের নামায ও বয়ান শেষ করে বাইরে বের হতেই দেখি কুয়ার ধারে তিন/চারটা বাচ্চা মেয়ে পানি নিচ্ছে। তখনও চারদিক পুরা ফর্সা হয়নি। পানি তোলা দেখার জন্যই ওদিকে নজর দিলাম। বোরখা আবৃত ছোট্ট মেয়ে আট/দশ বছর হয়ত বয়স হবে। লম্বা দড়ির মাথায় কন্টেনার বাঁধা। সেটা কুয়ার মধ্যে ছেড়ে দিয়ে দড়িধরে টানাটানি করল। তারপর বোধ হয় কন্টেনার ভর্তি হল। তখন টেনে তুলতে দেখলাম। নিচের হাত একটানে মাথার উপরে টান করে তুলে ধরে অপর হাতে হাটুর নিচের দড়ি ধরছে এবং একই ভাবে ঐ হাত উঠাচ্ছে। একেকবারে তিন/সাড়ে তিন হাত দড়িসহ পানি উঠছে। বেখেয়ালেই বোধহয় গুনছিলাম। অবাক হয়ে গেলাম যখন দেখলাম এক কন্টেনার (এক বদনার একটু বেশি) পানি তুলতে তাকে ষোল বার হাত উঠাতে হল। এর অর্থ বাচ্চাটি ওর হাতে প্রায় আটচল্লিশ/পঞ্চাশ হাত নিচে থেকে পানি তুলছে। এর অর্থ বড়দের হাতের প্রায় চল্লিশ হাত গভীর কুয়া থেকে ওকে অজুর জন্য এক কন্টেনার পানি তুলতে হচ্ছে। অথচ আমরা প্রায় বাংলাদেশের মতই ইচ্ছেমত পানি ব্যবহার করছি সবসময়। কেমন যেন নিজেকে হৃদয়হীন পাষন্ড ও অমানুষ বলে মনে হল। এদের এই কঠিন পরিশ্রমের পানি খরচ করার সময় একবারও এ কথা মনে হয়নি। মনটা খুব ছোট হয়ে গেল, নিজেকে কেমন যেন অপরাধী বলে মনে হতে লাগল। মনে মনে স্থির করলাম, এখন থেকে ইনশাআল্লাহ চেষ্টা করব এ রকম পানির অপচয় যেন না করি। চিন্তা করে দেখলাম, এই পানি নিয়ে মেয়েগুলো তাদের বাড়ী যাবে- জানিনা তাদের বাড়ী কত দূরে। তারপরও যদি কোন কারণে কেউ হঠাৎ কুয়ার মধ্যে পড়ে যায় তবে
