বাপা) স্টালিন সর্ব-বিশারদ, ভগবানের (রাম রাম!) ন্যায় সর্বজ্ঞ। বিরিঞ্চিবাবার ন্যায় তিনি চন্দ্রসূর্য ওয়েল না করিলে আকাশ পাতালের বন্দোবস্ত ভণ্ডুল হইয়া যাইবার নিদারুণ সম্ভাবনা। অতএব হাইল মস্কো। আমাদের এ ধর্ম পছন্দ হয় না। আতাতুর্ক পছন্দ করিতেন না বলিয়াই নব্যতুর্কের স্কন্ধ মক্কাবাগ হইতে ফিরাইয়া আঙ্কারাবাগে স্ক্রু টাইট করিয়া দিয়াছিলেন।
কথা হইতেছিল যে, জর্মন জনসাধারণ আপন মুক্তি আপন ঐতিহ্যের ভিতর দিয়া খুঁজিয়া লইতে চায়। তাই যদি হয় তবে বাইমার রিপাবলিকের বানচাল হইল কী করিয়া?
০৩.
সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের হাতে রাজ্যচালনার ভার সমর্পণ করাই যে প্রশস্ত ইহা বিচক্ষণ ব্যক্তি মাত্রই স্বীকার করিবেন। তাহার কারণ আমরা পূর্বেই নিবেদন করিয়াছি। বাইমার রিপাবলিককে সাফল্যমণ্ডিত করিবার আপ্রাণ চেষ্টা করিয়াছিলেন সোশ্যাল ডেমোক্রেটরা। জর্মনির খ্যাতনামা পণ্ডিত অধ্যাপক, গুণীজ্ঞানী— এক কথায় যাহারা জর্মনির গর্বস্বরূপ, তাহারা প্রায় সকলেই ছিলেন বাইমারের পিছনে, সোশ্যাল ডেমোক্রেটরূপে। আমরা বিশেষ করিয়া ইহাদের চিনিতাম, কারণ ইহাদের ভিতর আর্যামি গোঁড়ামি ভণ্ডামি ছিল না।
জর্মনির দুর্দিনে সোশ্যাল ডেমোক্রেটরা আপামর জনসাধারণকে এক পতাকার নিচে সমবেত করিয়া ইনফ্লেশন, বেকারি, নাস্তিক্য, উচ্ছলতা হইতে রক্ষা করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। পৃথিবী জয় করার উদ্দেশ্যে নতুন সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করার স্বপ্ন তাহারা দেখেন নাই। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় তাঁহারা বলিয়াছিলেন, মানবসংসারে ভালো লোকের দেয়ালি উৎসব চলিতেছে, প্রত্যেক জাতি আপন প্রদীপ উঁচু করিয়া তুলিলে তবে সে উৎসব সমাধা হইবে। পৃথিবীর শান্তি ও মঙ্গল তাহারা কামনা করেছিলেন বলিয়া ঠিক ওই সময়ে (১৯২০) রবীন্দ্রনাথকে তাঁহারা বিপুল সংবর্ধনা করিয়াছিলেন। জর্মন জনসাধারণ তখন রবীন্দ্রনাথের বাণীতে নিজের মূক আদর্শ প্রকাশ করিয়াছিল। কে না জানে ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বিশ্বপ্রেমের কবি, শান্তির প্রতীক, পদদলিতের পরিত্রাণ।
তথাপি ইংরেজ-ফরাসের ভয় ছিল যে সময়কালে সোশ্যাল ডেমোক্রেটরা বলশিদের সঙ্গে যোগদান করিবে। তাই যখন দেশের শিল্প-বাণিজ্যের উদ্ধার করিবার জন্য সোশ্যাল ডেমোক্রেটরা ইংরেজ-ফরাসি ধনপতিদের সাহায্য চাহিল তাহারা সাফ জবাব দিল। ফলে বেকারি বাড়িল, ব্রুনিং হাল সামলাইতে পারিলেন না। তার পর ফন পাপেন; শ্লাইশার গর্ভাঙ্কের ভিতর দিয়া নাৎসি যবনিকা পতন। ইংরেজের কথা ফলিল না, সোশ্যাল ডেমোক্রেটরা কম্যুনিস্টদের পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও নাৎসি অবিচারের বিরুদ্ধে ধর্মঘট করিতে রাজি হইলেন না।
সোশ্যাল ডেমোক্রেটরাই যে দেশের মেরুদণ্ড তাহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ এই যে, রুশেরা তাহাদের অধিকৃত অঞ্চলে ইহাদেরই প্রধান শক্তি স্বীকার করিয়া নিয়াছে। ইহাদেরই সঙ্গে আছেন ক্রিশ্চান ডেমোক্রেটিক পার্টি ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি। কম্যুনিস্টরাও আছেন, ও বেশ জোরে আছেন তাহাতে কোনও সন্দেহ নাই এবং ভিতরে ভিতরে রুশ সরকার যে তাহাদেরই সবচেয়ে বেশি সাহায্য করিবে তাহাতেও বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। কিন্তু রুশরা জানে যে, সোশ্যাল ডেমোক্রেটরা যদি বাঁকিয়া বসিয়া থাকে, তবে কম্যুনিস্টরা শুধু গায়ের জোরে তাহাদের প্রোগ্রাম চালু করতে পারিবে না। স্পষ্ট বোঝা যাইতেছে যে, রুশের চাল হইল সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের নটমঞ্চের সম্মুখে রাখিয়া দেশের প্রথম দুর্দিনের ধাক্কা তাহাদের দিয়া সহানো। রুশদের যথেষ্ট সাহায্য না পাইয়া যখন ব্রুনিং সরকারের মতো তাহাদের পার্টি-নৌকা বানচাল হইবে তখন কম্যুনিস্টরা আসরে নামিয়া দেশোদ্ধার করিবেন, অর্থাৎ গোটা রুশাধিকৃত অঞ্চলকে ইউএসএসআর-এর অঙ্গীভূত করিবেন। সে বিপদকালে সোশ্যাল ডেমোক্রেটরা যে কোনও কট্টর লাল-বিরোধী দর্গায় ধরনা দিবে তাহার উপায় নেই, কারণ রুশরা কট্টরদের নির্মমভাবে বিলোপ করিয়াছে ও করিতেছে। রুশরা জানে যে, উপস্থিত সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের লোকচক্ষে অপমানিত করার প্রয়োজন তাই তাহাদের সভামঞ্চে আনিঝার পূর্বে বেশ করিয়া মুসোলিনি-কায়দায় জোলাপ দেওয়া হইতেছে।
অস্ট্রিয়ায় রুশরা যে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করিয়াছে তাহাতেও ওই চাল। বিস্তর সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের হরেক রঙের পোর্টফোলিও দেওয়া হয়েছে, কিন্তু পুলিশ, অর্থ, প্রোপাগান্ডা অভ্যন্তরীণ মন্ত্রীর হাতে ও তিনি কম্যুনিস্ট। অর্থনৈতিক দিক দিয়াও রুশের বালাই কম। যে অঞ্চল দখল করিয়া বসিয়াছে সেখানে খানা-পিনা আছে, তাহার উপর ইউক্রেন আছে। সে অঞ্চলের সমস্ত কলকারখানা সরাইয়া রাশিয়ায় লইয়া গেলেও ইহাদের অন্তত অস্থিচর্মসার করিয়া রাখিতে কোনও বিশেষ অসুবিধা হইবে না।
মার্কিন-ইংরেজ কিন্তু কিছুতেই মনস্থির করিতে পারিতেছেন না। কর্তাদের বুদ্ধির বহর কতটুকু তাহা নিম্ন খবরটুকু হইতে বিলক্ষণ বোঝা গেল।
“জর্মনির কলকবজা যদি কাড়িয়া লই (অর্থাৎ ডিসইনডাসট্রিয়ালাইজ) তবে তাহারা না খাইয়া মরিবে, আর যদি না কাড়ি তবে চর্বচোষ্য লালিত হইয়া পুনর্বার মস্তকোত্তোলন করিয়া আমাদিগকে প্রহার করিবে।”
এই তথ্যটুকু কি বিজ্ঞের ন্যায় প্রচার করা হইল! ঘোড়াকে দানাপানি না দিলে সে মরিবে, তাহাতে আর নতুন কথা কী? আর দিলে সে গাড়ি টানিতে পারিবে (অর্থাৎ গায়ের জোরে রুশকে ঠেকাইতে পারিবে, কিন্তু মাঝে মাঝে তোমাকে লাথিও মারিবে)। গাড়ি যদি চালাইতে চাও, তবে তেজি ঘোড়া কিঞ্চিৎ দুরন্তপনা তো করিবেই। তুমি ভালো লাগাম কেনো না কেন?
দ্বিতীয় উদাহরণ পণ্য!
কাঠের অভাব হইয়াছে বলিয়া বার্লিনের যেসব অঞ্চলে ইংরেজ-মার্কিন প্রবেশ করিয়াছে, সেখান হইতে স্টালিনি সাইনবোর্ড সরানো হইয়াছে। খদ্দের যখন অশ্ব-বিক্রেতাকে বলিল, “বাড়ি গিয়া দেখিলাম, তোমার ঘোড়া খোঁড়া”, তখন সে বলিল, “আপনার বাড়ি তো বাজারের উত্তর দিকে, ওদিকে চলিলে আমার ঘোড়া খোঁড়া হয়ই!” খদ্দের বলিল, “তোমার যুক্তিটা তোমার ঘোড়ার মতোই খোঁড়া।”
(তৃতীয়) উদাহরণ,
কোনও কোনও জর্মন মেয়ে ইংরেজ সিপাহিদের নিকট হইতে চকলেট লইয়া চম্পট দেয়। আশ্চর্য! কিন্তু আমাদের এতদিন বিশ্বাস ছিল যে, সবদেশের মেয়েরাই এরকম করে। আর মেয়েদেরই-বা দোষ দেই কেন? তোমাদের সন্তুষ্টিকরণ (এপিজমেন্ট) অস্ট্রিয়া-চেকোশ্লোভাকিয়া চকলেট পকেটস্থ করিয়া হিটলার তো এই সেদিন তোমাদের বিশেষ অঙ্গুলি প্রদর্শন করিয়াছিল। রাজনৈতিক স্মৃতিশক্তি ক্ষীণ হয়, কিন্তু এতটা ক্ষীণ!
অধিকৃত জর্মনি চালনা সম্বন্ধে নিম্নলিখিত খবর হইতে বোঝা যায়, বরঞ্চ বলা উচিত বোঝা যায় না ইংরেজ-মার্কিনের নীতি কী।
কম্যুনিস্টরা রাজ্যশাসনে কোথাও নাই। বাভারিয়া ও নিম্নরাইনে দক্ষিণপন্থি ক্যাথলিকরা সর্বময় কর্তা। হামবুর্গ ও হানোফারে পার্টিমতামতহীন বণিক ও দক্ষিণপন্থি আমলারা গুছাইয়া লইতেছেন, যদিও অন্য কেউ কেউ বখরা পাইতেছেন। হেসেন ও মধ্য রাইনে সোশ্যাল ডেমোক্রেটরা রাজ্য-চালনার পুরোভাগে ও উত্তরপন্থি ক্যাথলিকদের আওতায় ওয়েস্টফালিয়া ও ওল্ডেনবুর্গে কিছুটা রাজত্ব করিতেছেন। তদুপরি বড় বড় নগরে ইহারাই মেয়র হইয়া বসিয়াছেন।
উৎকৃষ্ট প্রস্তাব। এ রকম পঁচিশ জায়গায় বত্রিশভাজা করিবার কী প্রয়োজন? এরকম দো-আঁসলা, তিন-আঁসলা জানোয়ার পয়দা করিবার এক্সপেরিমেন্ট কেন? ইংলন্ডে একবার টার্কি ও হেন (মুরগি) পক্ষীতে সংমিশ্রণ করাইয়া যখন টার্কিন পাখি পয়দা করা হয়, তখন ফ্রান্স বলিয়াছিল, “আমেরিকার এক আস্তাবলে গাধা ও একখানা ভাঙা বাইসাইকেল একসঙ্গে রাখার ফলে ফোর্ড গাড়ির জন্ম হয়েছিল।” সাধু সাবধান!
তাই বলিতেছি যে, প্রকৃষ্টতম পন্থা, সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের শুধু রাজ্য সমর্পণ করাই নয়, তাঁহাদের সম্পূর্ণ দ্বিধাহীন সাহায্যদান। রুশরা যেমন তাহাদের অধিকৃত অঞ্চলে সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের বোকা বানাইতে চাহে, তোমরা তেমনি তাহাদের সফলতার পথে লইয়া চল। জর্মন বড় জাত্যাভিমানী, পারতপক্ষে সে কখনও তাহার জাতীয়তাবোধ ত্যাগ করিতে চাহে না। তাহার দৃঢ় বিশ্বাস, তাহার মুক্তির পথ তাহারই ঐতিহ্যের তাহারই বৈদগ্ধ্যের ভিতর দিয়া। সে বলশির ধামাধরা হইতে চাহে না, তোমাদের গোলাম হইতে চাহে না। তাহাদের যদি স্বাধীনভাবে স্বচ্ছন্দে জীবনযাপন করিতে দাও তবে সে সকল শত্রুকে রোধ করিয়া শান্ত জীবনযাপন করিবেই। সোশ্যাল ডেমোক্রেটরা শান্তি চায়।
আর শেষ কথা তো এই যে, স্বায়ত্তশাসনে সর্বজাতির অধিকার। সোশ্যাল ডেমোক্রেটরা জর্মনজাতির যাহা শ্রেষ্ঠ, যাহা বরণীয় তাহারই প্রতীক।
