উৎসর্গ
কবিতাকে
যার ওপর সকল দায়িত্ব ছেড়ে নিশ্চিন্তে জেল খাটতে পেরেছি।
প্রসঙ্গ কথা
আমি যা পারিনি আমাদের প্রিয় ছাত্র মনোয়ার হোসেন রানার হাতে সেই কঠিন কাজটি সম্পন্ন হতে দেখে আমি শুধুমাত্র প্রীতবোধ করছিনা, ভীষণভাবে গর্ব অনুভব করছি। জেলখানা এক অর্থে জীবন্ত মানুষের কবর। কবরের খবর যেমন অন্ধকারাচ্ছন্ন, জেলখানার সঠিক চিত্রও তেমনি সবার অজানা। কিন্তু জেলখানায় অসংখ্য আদম সন্তান ধুঁকে ধুঁকে মরে। কত ফুল যে জেলখানায় ঝরে যায়, কত স্বপ্ন যে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়, কত মানুষ যে ‘অমানুষ’ হয়ে নরকের অভ্যন্তরে নিক্ষিপ্ত হয় তার খবর কেউ রাখে না। যারা কারণে অথবা অ-কারনে জেলে যেতে বাধ্য হয়, জেল থেকে ফিরে এসে তারাও তা ভুলে যায়, কেননা দুঃস্বপ্নকে সবাই ভুলে যেতে চায়। কিন্তু ভুলে গেলেই যে জেল জীবনের দুঃসহ অভিজ্ঞতার অবসান হয় না, জেলখানায়ও যে অসংখ্য মানুষ বাস করে এবং তারাও যে এই সমাজের মানুষ, তাদেরও যে মানবিক বোধ রয়েছে, সুখ-দুঃখের অনুভূতির অধিকারী যে তারাও এবং সমাজ সচেতন ব্যক্তি বর্গের যে তা ভোলা উচিত নয়, মনোয়ার হোসেন রানা সেই তিক্ত সত্যটি সবার সামনে উপস্থাপন করেছেন অত্যন্ত যত্নের সাথে তার বস্তুনিষ্ঠ দলিল জেলাখানার দিনগুলিতে। রানা তার এই বইটিতে বহু অজানা তথ্যের সমাবেশ ঘটিয়ে, আকর্ষণীয় ঢং-এ, জেলজীবনের মানবিক দিকটি তুলে ধরেছেন সবার সামনে।
১৯৫৪ সালের ৩১ মে। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ফজলুল হক মুসলিম হল ছাত্র সংসদের ভিপি। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের পরে পূর্ব পাকিস্তানে শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রী পরিষদকে পাকিস্তানের বলদর্পী শাসকরা বাতিল করে দেশে ৯২-ক ধারা জারির মাধ্যমে এক নৈরাজ্য সৃষ্টি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠলে বহু সংখ্যক নেতৃস্থানীয় ছাত্রকে তখন গ্রেফতার করা হয়। আমাকে গ্রেফতার করে জেলখানায় নেয়া হয় প্রিভেন্টিভ ডিটেনশনের আওতায়। গ্রেফতার করা হয় সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভিপি এবিএম আবদুল লতিফকে, অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ইশতিয়াক আহমদকে। সরদার ফজলুল করিম তখন জেলেই ছিলেন। সবার অনুরোধে আমি অঙ্গীকার করেছিলাম, জেলখানার অবস্থা সম্পর্কে লিখবো। লিখতে পারিনি। দীর্ঘ ৪৬ বছর পরে আমাদের প্রিয় ছাত্র মনোয়ার হোসেন রানা সেই কাজটি করেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। লেখক একজন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক কর্মী হলেও বইটিতে রাজনীতির কথার চেয়ে দুর্গত জেলজীবনের করুন কাহিনীই প্রধান্য পেয়েছে।
