০১.
প্রবাদ আছে, বঙ্গদেশে সংস্কৃত উচ্চারণ এককালে এমনই বিকৃত হইয়া পড়িয়াছিল যে, মহারাজা আদিশূর কানাকুজ হইতে শ্রীহর্ষ, ভট্টনারায়ণ (কেহ কেহ বলেন ক্ষিতীশ, মেধাতিথি) ইত্যাদি পাঁচজন ব্রাহ্মণকে এদেশে নিমন্ত্রণ করিয়া আনয়ন করেন। তাহারা এদেশের লোককে শুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণ কতটা শিখাইতে সমর্থ হইয়াছিলেন জানিবার উপায় নাই। ইহার পর আমাদের জানামতে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ এদেশে আবার সেই চেষ্টা করেন। কিন্তু তাহার চেষ্টাও ব্যর্থ হয়।
ইতোমধ্যে শত শত বছর ধরিয়া বহু বাঙালি বিদ্যার্থী কাশীতে সংস্কৃত শিখিয়া আসিয়াছেন, কিন্তু তাহাদের উচ্চারণও এদেশে প্রভাব বিস্তার করিতে পারে নাই। এমনকি কাশী-প্রত্যাবৃত্ত কোনও কোনও বাঙালি পণ্ডিতকে আমরা খাঁটি বাংলা উচ্চারণে সংস্কৃত পড়িতে শুনিয়াছি। সন্দেহ হইতেছে খাস কাশীতেও বাঙালি চালিত টোলে বাংলা কায়দায় সংস্কৃত উচ্চারণ শিখানো হয়।
বাংলা কায়দায় সংস্কৃত উচ্চারণ ব্যাপারটা যে কতদূর মারাত্মক তাহা একটি সামান্য উদাহরণ হইতেই পাঠক বুঝিতে পারিবেন। প্রায় পঁচিশ বছর পূর্বে ইতালির খ্যাতনামা সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত অধ্যাপক তুচ্চি কলকাতার তকালীন এক বিখ্যাত পণ্ডিতের সঙ্গে শাস্ত্রালোচনা করিতেছিলেন। কথায় কথায় পণ্ডিতশ্রেষ্ঠ ঋষি যাজ্ঞবন্ধ্যের নাম উচ্চারণ করেন। বাঙালি যে কায়দায় করে, সেই কায়দায়ই করিলেন, অনেকটা জাগেগাঁবোল্কোর ন্যায়। তুচ্চি তো কিছুতেই বুঝিতে পারেন না। কাহার কথা হইতেছে। পণ্ডিতের চক্ষুস্থির যে তুচ্চির মতো লোক যাজ্ঞবন্ধ্যের নাম শোনেন নাই। তুষ্টি প্রত্যাশা করিতেছেন যাজ্ঞবন্ধ্যের শুদ্ধ উচ্চারণ অনেকটা Yajnyavalkya-র ন্যায়, শুনিতেছেন Jaggonbolkol. বুঝিবেন কী প্রকারে যে একই ব্যক্তি!
বাঙালির সংস্কৃত উচ্চারণ এতই কর্ণপীড়াদায়ক যে, আমাদের পরিচিত দুইটি পশ্চিম ভারতীয় ছাত্রকে বাধ্য হইয়া কলকাতা কলেজে সংস্কৃত অধ্যয়ন ত্যাগ করিতে হইল। পরশুরামের গল্পেীজী মেঘনাদবধকাব্য উচ্চারণ করিলে আমাদের কর্ণে যে পীড়ার সঞ্চার হইবে, আমাদের সংস্কৃত উচ্চারণ পশ্চিম ও উত্তর ভারতীয়দের সেই রকমই পীড়া দেয়।
