আদম আলাইহিস সালাম: সৃষ্টির আদি কথা

« <
/ 40
> »

সৃষ্টির আদি কথা—যখন আল্লাহ ছাড়া আর কিছু ছিল না
অস্তিত্বের এক রহস্যঘেরা অধ্যায়। সময় তখনো সময়ের জন্ম দেয়নি, মহাকাশ তখনো তার বিশালতা নিয়ে বিস্তৃত হয়নি। কোনো নক্ষত্রের মিটিমিটি আলো ছিল না, ছিল না কোনো গ্রহ বা ছায়াপথ। চারদিকে শুধু এক অসীম, আদিগন্ত স্তব্ধতা। এই অনন্ত শূন্যতার মাঝে কেবল একজনেরই অস্তিত্ব ছিল—তিনি আল্লাহ। মহান, পরাক্রমশালী, অনাদি ও অনন্ত।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে যখন সৃষ্টির এই সূচনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি বলেছিলেন:

“আল্লাহ ছিলেন, আর তাঁর পূর্বে কোনো কিছু ছিল না। তাঁর আরশ (সিংহাসন) ছিল পানির ওপর।” [সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩১৯১]

সেই অনাদি কালে, আল্লাহ যখন জগৎ সৃষ্টির ইচ্ছা পোষণ করলেন, তিনি প্রথমে সৃষ্টি করলেন ‘কলম’। অস্তিত্বহীনতার নিস্তব্ধতা ভেঙে প্রথম ধ্বনিত হলো মহান রবের আদেশ— “লেখো!”

কলম কম্পিত স্বরে জিজ্ঞেস করল, “হে প্রতিপালক, আমি কী লিখব?”

আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিলেন, “কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে, তার সবকিছুর তাক্বদীর বা নিয়তি লিপিবদ্ধ করো।” [সুনান আবূ দাউদ, হাদীস: ৪৭০০]

সেই বিশাল জলরাশি আর আরশের নিচে বসে কলম লিখে চলল মহাবিশ্বের মহাকাব্য। প্রতিটি ধূলিকণা থেকে শুরু করে বিশাল নক্ষত্রপুঞ্জ, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণু থেকে শুরু করে অনাগত কালের প্রতিটি প্রাণীর দীর্ঘশ্বাস—সবকিছুই সেই অমোঘ কিতাবে বা ‘লাওহে মাহফূয’-এ গেঁথে দেওয়া হলো।

অতঃপর আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির এক মহায়োজন শুরু হলো। ছয়টি বিশাল কালখণ্ডে সুনিপুণ কারুকার্যময় এই মহাবিশ্ব প্রস্তুত হলো। আসমানগুলো তার বিশালতা নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল স্তম্ভ ছাড়াই, আর জমিনকে বিছিয়ে দেওয়া হলো এক শান্ত বিছানার মতো। কিন্তু এই সাজানো বাগান তখনো নীরব। এখানে পশুপাখি ছিল, জিন জাতি ছিল, কিন্তু খোদায়ী মহব্বতের এক বিশেষ আমানত বহন করার মতো কেউ ছিল না।

অদৃশ্য জগতের অধিবাসী ফেরেশতারা তখন কেবল তসবিহ আর পবিত্রতা বর্ণনায় ব্যস্ত। তারা নূরের তৈরি, নিখুঁত অনুগত। কিন্তু মহান আল্লাহর প্রজ্ঞাময় পরিকল্পনায় এমন এক সত্তার অভাব ছিল, যার মধ্যে থাকবে ইচ্ছা শক্তি, বিবেক আর মাটির গভীর মমতা।

সময় ঘনিয়ে আসছিল। আরশের অধিপতি চাইলেন এমন একজনকে সৃষ্টি করতে, যে হবে তাঁর ‘খলীফা’ বা প্রতিনিধি। এই সিদ্ধান্তই মহাবিশ্বের ইতিহাসে আনতে যাচ্ছিল এক অভাবনীয় মোড়। জগত তখনো জানত না, এক মুঠো অবহেলিত মাটি থেকে তৈরি হতে যাচ্ছে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ এক বিস্ময়—আদম।

« <
/ 40
> »