দীর্ঘ সময় মাটির কাঠামো হিসেবে অবস্থান ও ইবলীসের পর্যবেক্ষণ
জান্নাতের সুউচ্চ তোরণের কাছে তখন শুয়ে আছে এক বিশাল অবয়ব। নূরের ফেরেশতারা যখন সেই পথ দিয়ে যাতায়াত করতেন, তাঁরা বিস্ময় ও কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে দেখতেন মাটির তৈরি সেই নিথর দেহটিকে। এটি কেবল একতাল মাটি ছিল না, বরং মহান আল্লাহ নিজ কুদরতি হাতে একে সুঠাম ও সুষম রূপ দিয়েছিলেন। দীর্ঘ চল্লিশ বছর—কারও মতে আরও দীর্ঘকাল—আদম (আ.)-এর সেই দেহটি প্রাণহীন অবস্থায় সেখানে পড়ে ছিল।
মাটির সেই দেহটি যখন রৌদ্রে শুকানো মাটির পাত্রের মতো ঠনঠনে (‘সালসাল’) হয়ে উঠল, তখন তা থেকে এক প্রকার শব্দ হতো। এই শব্দহীন নিস্তব্ধতার মধ্যে এক জোড়া কুটিল চোখ গভীর পর্যবেক্ষণে লিপ্ত ছিল। সে আর কেউ নয়—ইবলীস।
ইবলীস তখনো ফেরেশতাদের কাতারে শামিল হয়ে ইবাদত করত, কিন্তু তার অন্তরে ছিল গোপন অহংকার। সে যখনই আদমের সেই বিশালাকায় দেহটি দেখত, তার ভেতরটা ঈর্ষায় জ্বলে উঠত। সে ভাবত, “আমি আগুনের তৈরি শ্রেষ্ঠ এক সত্তা, আর এই নিকৃষ্ট মাটি দিয়ে কী এমন সৃষ্টি করা হচ্ছে?”
হাদীসের বর্ণনায় এসেছে, ইবলীস আদমের সেই দেহের চারপাশ দিয়ে চক্কর দিত। সে কৌতূহলবশত মাটির সেই কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করত এবং অন্যদিক দিয়ে বেরিয়ে আসত। সে যখন দেখল যে এই দেহটি ভেতর থেকে ফাঁপা, তখন সে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল:
“এ তো এক অন্তঃসারশূন্য সৃষ্টি! একে খুব সহজেই পরাস্ত করা যাবে।” [সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৬১১]
সে আরও বলত, “যদি আমাকে এর ওপর কর্তৃত্ব দেওয়া হয়, তবে আমি একে ধ্বংস করে দেব। আর যদি একে আমার ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয়, তবে আমি এর অবাধ্যতা করব।”
ইবলীস আদমের মাটির শরীরে হাত দিয়ে আঘাত করত, আর ঠনঠনে মাটির সেই খটখটে আওয়াজ শুনে সে নিজেকে সান্ত্বনা দিত যে, মাটির এই তুচ্ছ পুতুল তার নূরাণী ও অগ্নিময় মর্যাদার ধারেকাছেও আসতে পারবে না। কিন্তু সে জানত না, এই কাঠামোর ভেতরে আল্লাহ এমন এক ‘রূহ’ ফুঁকতে যাচ্ছেন, যার মহিমা বোঝার ক্ষমতা কোনো জিন বা ফেরেশতার নেই।
আদমের দেহটি তখনো স্তব্ধ, শীতল। কিন্তু মহাবিশ্বের ঘড়িতে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ঘনিয়ে আসছিল, যখন এই নির্জীব মাটি এক জীবন্ত মানবে রূপান্তরিত হবে। ইবলীসের এই অহংকারই যে তার পতনের মূল কারণ হতে যাচ্ছে, তা সে তার অন্ধকারচ্ছন্ন বুদ্ধিতে কল্পনাও করতে পারেনি।
