আদম আলাইহিস সালাম: সৃষ্টির আদি কথা

« <
/ 40
> »

হাবীল ও ক্বাবীলের জন্ম এবং তাদের চারিত্রিক ভিন্নতা
হাবীল এবং ক্বাবীল—দুই ভাই হলেও তাঁদের স্বভাব ও রুচি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত।

হাবীল: তিনি ছিলেন শান্ত, দয়ালু এবং অত্যন্ত পরহেযগার। তিনি মেষ পালন করতেন। প্রকৃতির সাথে তাঁর এক নিবিড় সম্পর্ক ছিল এবং আল্লাহর প্রতি তাঁর ছিল অগাধ বিশ্বাস ও ভালোবাসা।

ক্বাবীল: তিনি ছিলেন কঠোর স্বভাবের, জেদী এবং কিছুটা অহংকারী। তিনি ছিলেন কৃষক। চাষাবাদের কঠিন পরিশ্রমে তাঁর মনও যেন রুক্ষ হয়ে গিয়েছিল।

যখন বিবাহের সময় এল, তখন দেখা গেল ক্বাবীলের সাথে জন্ম নেওয়া বোন আকলিমা ছিল অত্যন্ত সুন্দরী। অন্যদিকে হাবীলের সাথে জন্ম নেওয়া বোন লিউযা ছিল তুলনামূলক কম সুন্দরী। শরী‘আতের বিধান অনুযায়ী ক্বাবীলকে বিয়ে করতে হবে লিউযাকে, আর হাবীলকে বিয়ে করতে হবে আকলিমাকে।

ক্বাবীল এই বিধান মানতে অস্বীকার করল। তার ভেতরে ইবলীসের সেই পুরনো ‘অহংকার’ মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। সে বলল, “আকলিমা আমার সাথে জন্মেছে, সে আমারই প্রাপ্য।” আদম (আ.) তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে এটি আল্লাহর নির্দেশ, কিন্তু ক্বাবীল তার জেদে অটল রইল।

এই পারিবারিক বিরোধ মেটানোর জন্য আদম (আ.) এক চূড়ান্ত প্রস্তাব দিলেন। তিনি বললেন, “তোমরা উভয়েই আল্লাহর দরবারে একটি করে কুরবানী পেশ করো। যার কুরবানী কবুল হবে, সেই আকলিমাকে বিয়ে করার হকদার হবে।”

শুরু হলো সত্য ও মিথ্যার এক কঠিন পরীক্ষা। যে পরীক্ষার পরিণতি পৃথিবীর ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দেবে।

২৯শ অধ্যায়: প্রথম কুরবানী—হাবীলের নিষ্ঠা বনাম ক্বাবীলের অহংকার
আদম (আ.)-এর সেই যুগান্তকারী প্রস্তাবের পর দুই ভাই তাঁদের কুরবানীর প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন। এটি কেবল একটি বিবাহের ফয়সালা ছিল না, বরং এটি ছিল মহান আল্লাহর কাছে কার অন্তরের তাক্বওয়া বা খোদাভীতি কতটুকু, তার এক অগ্নিপরীক্ষা।

হাবীল, যিনি ছিলেন একজন পশুপালক, তিনি তাঁর পালের সবচেয়ে হৃষ্টপুষ্ট, নিখুঁত এবং সেরা মেষটি বেছে নিলেন। তিনি ভাবলেন, “আমি আমার প্রিয়তম রবকে উৎসর্গ করছি, তাই সবচেয়ে দামী জিনিসটিই দেব।” তাঁর অন্তরে ছিল বিনয় আর আল্লাহর সন্তুষ্টির তীব্র আকাঙ্ক্ষা।

অন্যদিকে ক্বাবীল, যিনি ছিলেন কৃষক, তিনি তাঁর ফসলের মধ্য থেকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট, পচা এবং নিম্নমানের কিছু শস্য কুড়িয়ে নিলেন। তিনি ভাবলেন, “যাই দেই না কেন, তা তো আর আসমানে যাবে না, এখানে পড়ে থাকলেই হলো।” তাঁর অন্তরে ছিল অহংকার, জেদ আর অবাধ্যতা।

উভয়েই নিজ নিজ কুরবানী একটি পাহাড়ের চূড়ায় রেখে অপেক্ষায় রইলেন। সেই যুগে কুরবানী কবুল হওয়ার নিদর্শন ছিল—আসমান থেকে একখণ্ড অলৌকিক আগুন (বিচ্ছুরিত আলো) নেমে এসে কবুল করা বস্তুটি জ্বালিয়ে দেবে।

হঠাৎ মেঘমুক্ত আকাশ থেকে এক টুকরো নূরানি শিখা নেমে এল এবং চোখের পলকে হাবীলের সেই সুন্দর মেষটিকে স্পর্শ করল। মেষটি অদৃশ্য হয়ে গেল—যার অর্থ হাবীলের কুরবানী কবুল হয়েছে। অন্যদিকে ক্বাবীলের সেই পচা শস্যগুলো আগের মতোই অবহেলিত অবস্থায় পড়ে রইল।

পবিত্র কুরআনের ভাষায়:

“তাদের একজনের কুরবানী কবুল করা হলো এবং অন্যজনের কুরবানী কবুল করা হলো না।” [সূরাহ আল-মায়েদাহ: ২৭]

ক্বাবীলের হীনম্মন্যতা আর হিংসা এবার আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। নিজের ব্যর্থতাকে মেনে না নিয়ে সে হাবীলের ওপর চরম ক্রোধান্বিত হলো।

৩০শ অধ্যায়: ক্বাবীল কর্তৃক হাবীল হত্যা—পৃথিবীতে প্রথম রক্তপাত
কুরবানী কবুল না হওয়ায় ক্বাবীলের পরাজয় স্পষ্ট হয়ে গেল, কিন্তু তার ভেতরের ইবলীসি প্রবৃত্তি তাকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে তুলল। সে তার ভাইকে লক্ষ্য করে চিৎকার করে বলল:

“সে (ক্বাবীল) বলল, ‘আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব’।” [সূরাহ আল-মায়েদাহ: ২৭]

শান্ত ও বিনয়ী হাবীল বিচলিত হলেন না। তিনি পরম মমতায় তার ভাইকে বোঝাতে চাইলেন। তিনি বললেন:

“হাবীল বলল, ‘আল্লাহ তো কেবল মুত্তাক্বীদের (পরহেযগার) কুরবানী কবুল করেন। তুমি যদি আমাকে হত্যা করার জন্য হাত বাড়াও, তবে আমি তোমাকে হত্যা করার জন্য হাত বাড়াব না; কারণ আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি’।” [সূরাহ আল-মায়েদাহ: ২৭-২৮]

হাবীলের এই মহানুভবতা ক্বাবীলকে শান্ত করার পরিবর্তে আরও উত্তেজিত করল। শয়তান তাকে প্ররোচনা দিতে লাগল যে, হাবীল বেঁচে থাকলে সে সমাজে এবং বাবার কাছে অপমানিত হবে। একদিন হাবীল যখন নিভৃতে ঘুমিয়ে ছিলেন, ক্বাবীল সুযোগ বুঝে একটি ভারী পাথর বা ধারালো যন্ত্র দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করল।

মুহূর্তের মধ্যে হাবীলের নিথর দেহটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। সবুজ ঘাস লাল রক্তে ভিজে গেল। ফেরেশতারা আঁতকে উঠলেন—মহাবিশ্বের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো মানুষ অন্য মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করল।

ক্বাবীল স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ক্রোধের জোয়ার নেমে যাওয়ার পর সে দেখল এক ভয়ংকর শূন্যতা। তার সামনে পড়ে আছে তার ভাইয়ের নিস্পন্দ দেহ, যা একটু আগেও কথা বলছিল। সে এখন কী করবে? এই দেহটি সে কোথায় লুকাবে? এই প্রথম মৃত্যু, এই প্রথম লাশ—ক্বাবীল যেন এক দিশেহারা জন্তুর মতো হাহাকার করে উঠল।

৩১শ অধ্যায়: হাবীলের মৃত্যুতে আদম (আ.)-এর শোক ও ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা
আদম (আ.) তখন দূরে ছিলেন। তাঁর অন্তরে এক অজানা আশঙ্কার ছায়া ঘনীভূত হচ্ছিল। যখন তিনি হাবীলের নিখোঁজ হওয়ার খবর পেলেন এবং ক্বাবীলের মুখাবয়বে অপরাধের চিহ্ন দেখলেন, তখন তাঁর বুঝতে বাকি রইল না যে ভয়ংকর কিছু ঘটে গেছে।

অবশেষে যখন তিনি হাবীলের রক্তাক্ত লাশের খোঁজ পেলেন, তখন বার্ধক্যের ভারে নয় বরং শোকের ভারে তাঁর বুক ফেটে যাচ্ছিল। জান্নাত থেকে বিচ্ছেদের পর এটি ছিল তাঁর জীবনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শোক। তিনি কেবল কাঁদছিলেন না, বরং শয়তানের এই কুটিল চালে তাঁর সন্তানদের ধ্বংস হতে দেখে মর্মাহত হচ্ছিলেন।

তিনি বললেন, “হে পৃথিবী! তোমার ওপর আজ এমন এক জুলুম হয়েছে যা কোনোদিন মোছার নয়।”

আদম (আ.) তাঁর সেই কঠিন সময়েও ধৈর্যের পরিচয় দিলেন। তিনি ক্বাবীলকে অভিশাপ না দিয়ে আল্লাহর ফয়সালার ওপর সোপর্দ করলেন। ক্বাবীল তাঁর বাবার সামনে দাঁড়ানোর সাহস হারিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। আদম (আ.) উপলব্ধি করলেন, জান্নাতের বাইরে এই দুনিয়া এক নিরন্তর পরীক্ষার ক্ষেত্র, যেখানে নিজের রক্তও অন্যের জন্য বিষ হয়ে উঠতে পারে।

পৃথিবীর প্রথম শহীদ হলেন হাবীল, আর প্রথম খুনি হিসেবে ক্বাবীলের নাম ইতিহাসের পাতায় কলঙ্কিত হয়ে রইল।

৩২শ অধ্যায়: দাফন কার্য শিক্ষা—কাকের মাধ্যমে প্রাপ্ত শিক্ষা
হাবীলের নিথর দেহের সামনে ক্বাবীল যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তখন তার মনে অপরাধবোধের চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিল এক অদ্ভুত অসহায়ত্ব। সে জানত না এই মৃতদেহের শেষ পরিণতি কী। পৃথিবীর বুকে এর আগে কোনো মানুষ মারা যায়নি, তাই দাফন বা সৎকার বলতে কী বোঝায়, তা ছিল তার ধারণার বাইরে।

সে হাবীলের লাশটি কাঁধে নিয়ে বা টেনে হিঁচড়ে দিগ্বিদিক ঘুরতে লাগল। সে চাইছিল লাশটি কোথাও লুকিয়ে ফেলতে, কিন্তু মাটির ওপর ফেলে রাখলে বন্যপশুরা তা ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে—এই ভয়ে সে অস্থির হয়ে পড়ল। ঠিক সেই মুহূর্তে মহান আল্লাহ তাকে একটি বিশেষ উপায়ে শিক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

ক্বাবীল দেখল, তার চোখের সামনে দুটি কাক লড়াই করছে। লড়াইয়ের এক পর্যায়ে একটি কাক অন্যটিকে মেরে ফেলল। এরপর জীবিত কাকটি তার ঠোঁট ও পা দিয়ে মাটি খুঁড়ে একটি গর্ত তৈরি করল এবং মৃত কাকটিকে সেই গর্তে শুইয়ে দিয়ে মাটি চাপা দিল।

কুরআন মাজীদে এই দৃশ্যটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে:

“অতঃপর আল্লাহ একটি কাক পাঠালেন, যে মাটি খুঁড়ছিল যাতে তাকে (ক্বাবীলকে) দেখাতে পারে কীভাবে সে তার ভাইয়ের মৃতদেহ গোপন করবে। সে বলল, ‘হায় আফসোস! আমি কি এই কাকটির মতোও হতে পারলাম না যে, আমার ভাইয়ের মৃতদেহ গোপন করি?’ অতঃপর সে লজ্জিত হলো।” [সূরাহ আল-মায়েদাহ: ৩১]

কাকটির এই আচরণ দেখে ক্বাবীল ডুকরে কেঁদে উঠল। সে বুঝতে পারল, সে কেবল খুনিই নয়, বরং সে অত্যন্ত জ্ঞানহীন। সে কাকের অনুকরণে মাটি খুঁড়ে হাবীলকে দাফন করল। এটিই ছিল মানব ইতিহাসে কবরের সূচনা।

৩৩শ অধ্যায়: ক্বাবীলের পলায়ন ও বংশধরদের মধ্যে ফিতনার বিস্তার
হাবীলের দাফন সম্পন্ন করার পর ক্বাবীল আর তার পিতা আদম (আ.)-এর সামনে দাঁড়ানোর সাহস পেল না। তার ললাটে তখন খুনের কলঙ্ক এবং হৃদয়ে অভিশপ্ত শয়তানের প্ররোচনা। আদম (আ.) যখন ক্বাবীলকে তাঁর সামনে থেকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন, তখন ক্বাবীল তার স্ত্রী আকলিমাকে নিয়ে লোকালয় ছেড়ে অনেক দূরে ‘ইয়েমেন’ বা অবহেলিত কোনো পাহাড়ি অঞ্চলে চলে গেল।

সেখানে গিয়ে ক্বাবীল এক ভিন্ন জীবন শুরু করল। সে আল্লাহর ইবাদত ত্যাগ করে নফসের পূজা শুরু করল। ইবলীস তাকে কুমন্ত্রণা দিল যে, হাবীলের কুরবানী কবুল হয়েছিল কারণ সে আগুনের পূজা করত। এই মিথ্যা প্ররোচনায় পড়ে ক্বাবীলের বংশধরদের মধ্যে অগ্নিপূজা এবং শিরকের বীজ রোপিত হলো।

ক্বাবীলের বংশধরেরা পাহাড়ের পাদদেশে এক ভোগবিলাসী সমাজ গড়ে তুলল। সেখানে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার, অশ্লীলতা এবং মূর্তিপূজার মতো পাপাচার ছড়িয়ে পড়তে লাগল। অন্যদিক পাহাড়ের ওপরে আদম (আ.) ও তাঁর যোগ্য উত্তরসূরিরা আল্লাহর একত্ববাদের ওপর অটল রইলেন। এভাবেই পৃথিবীতে প্রথম ‘حق’ (সত্য) ও ‘باطل’ (মিথ্যা)-এর দুটি আলাদা জনপদ সৃষ্টি হলো।

৩৪শ অধ্যায়: শীষ (আ.)-এর জন্ম—এক পবিত্র উপহার
হাবীলের বিচ্ছেদ এবং ক্বাবীলের পলায়নের পর আদম ও হাওয়া (আ.)-এর জীবনে এক দীর্ঘ বিষণ্ণতা বিরাজ করছিল। ঠিক সেই শোকাতুর সময়ে মহান আল্লাহ তাঁদের কোল আলো করে এক বরকতময় সন্তান দান করলেন। তিনি হলেন শীষ (আ.)।

আরবী ‘শীষ’ শব্দের অর্থ হলো ‘হিবাতুল্লাহ’ বা আল্লাহর দান। আদম (আ.) তাকে এই নামে ডেকেছিলেন কারণ তিনি মনে করতেন, হাবীলের শূন্যস্থান পূরণ করতেই আল্লাহ তাঁকে এই নেককার সন্তান দিয়েছেন। শীষ (আ.) জন্মগতভাবেই ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, মেধাবী এবং একনিষ্ঠ ইবাদতকারী।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এক হাদীসে এসেছে যে, আল্লাহ তা‘আলা মোট একশত চারটি সহীফা (ছোট আসমানী কিতাব) নাযিল করেছিলেন, যার মধ্যে পঞ্চাশটিই নাযিল হয়েছিল শীষ (আ.)-এর ওপর। [সহীহ ইবনে হিব্বান]

আদম (আ.) তাঁর সমস্ত আধ্যাত্মিক জ্ঞান এবং নবুওয়াতের গোপন রহস্যগুলো শীষ (আ.)-কে শিক্ষা দিতে লাগলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাঁর ইন্তেকালের পর এই ছেলেই হবে একত্ববাদের ঝাণ্ডাবাহী এবং মানবজাতির প্রকৃত পথপ্রদর্শক।

৩৫শ অধ্যায়: সন্তানদের প্রতি নবুওয়াতী দাওয়াত ও তাওহীদের শিক্ষা
আদম (আ.)-এর বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাঁর বংশধররা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। শস্যের ক্ষেত, পশুপালের চারণভূমি আর পাহাড়ের গুহা ছাপিয়ে গড়ে উঠল ছোট ছোট জনপদ। আদম (আ.) কেবল তাঁদের পিতা ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন পৃথিবীর প্রথম নবী ও শিক্ষক। তিনি নিয়মিত তাঁর সন্তানদের ও নাতি-পুতিদের একত্রিত করতেন এবং এক আল্লাহর ইবাদত করার নির্দেশ দিতেন।

তিনি তাঁদের জান্নাতের সেই হারানো দিনের গল্প শোনাতেন। তিনি বলতেন, “হে আমার সন্তানেরা! ইবলীস আমাদের প্রকাশ্য শত্রু। সে আমাদের জান্নাত থেকে বের করেছে। তোমরা যেন তার ধোঁকায় পড়ে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত না হও।” তিনি তাঁদেরকে সিজদাহ, তওবা এবং পবিত্রতা অর্জনের নিয়মাবলী শিক্ষা দিতেন।

আদম (আ.)-এর নবুওয়াতী দাওয়াতের মূল ভিত্তি ছিল ‘তাওহীদ’ বা আল্লাহর একত্ববাদ। তিনি অত্যন্ত কঠোরভাবে সতর্ক করতেন যেন কেউ ক্বাবীলের বংশধরদের মতো অশ্লীলতা ও পাপাচারের পথে পা না বাড়ায়। তাঁর এই শিক্ষার প্রভাবে একটি বিশাল গোষ্ঠী দীর্ঘকাল পর্যন্ত একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদতে রত ছিল।

অষ্টম অংশ: উত্তরসূরি ও ভবিষ্যৎ দর্শন
৩৬শ অধ্যায়: রূহের জগতে (আলমে আরওয়াহ) সন্তানদের শপথ গ্রহণ
সৃষ্টির সেই আদিলগ্নে যখন আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছিল, তখনই এক অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল যার প্রভাব কিয়ামত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে। মহান আল্লাহ আদম (আ.)-এর পৃষ্ঠদেশ (পাজর) থেকে কিয়ামত পর্যন্ত আগত তাঁর সমস্ত সন্তানকে (রূহ বা আত্মা হিসেবে) বের করে আনলেন।

পবিত্র কুরআনের বর্ণনায় সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি ছিল এমন:

“আর যখন তোমার প্রতিপালক বনী আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করলেন এবং তাদের নিজেদের ওপর সাক্ষী করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই! আমরা সাক্ষী দিচ্ছি’।” [সূরাহ আল-আ‘রাফ: ১৭২]

এটিই ছিল ‘আহদে আল্স্ত’ বা আদি শপথ। আদম (আ.) সেদিন তাঁর চোখের সামনে অনাগত কোটি কোটি সন্তানদের রূহকে বিন্দুর মতো ঝলমল করতে দেখেছিলেন। তাঁদের মধ্যে কেউ ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল নূরের অধিকারী—যাঁরা ছিলেন পরবর্তী যুগের নবী ও রাসূল। আদম (আ.) নিজের সন্তানদের এই বিশাল মিছিল দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন।

৩৭শ অধ্যায়: দাউদ (আ.)-এর আয়ু বৃদ্ধির ঘটনা ও আদম (আ.)-এর দান
রূহের জগতের সেই দৃশ্যে আদম (আ.) লক্ষ্য করলেন একটি রূহ বিশেষভাবে চমকাচ্ছে। তাঁর ললাটের নূর অন্য সবার চেয়ে আলাদা। আদম (আ.) জিজ্ঞেস করলেন, “হে আমার প্রতিপালক! এই ব্যক্তিটি কে?” আল্লাহ তা‘আলা উত্তর দিলেন, “এ তোমার সন্তানদের মধ্য থেকে শেষ যুগের একজন নবী, যার নাম দাউদ।”

আদম (আ.) দাউদ (আ.)-এর প্রতি বিশেষ এক টান অনুভব করলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তাঁর আয়ু কত নির্ধারণ করা হয়েছে?” আল্লাহ বললেন, “ষাট বছর।” আদম (আ.) ব্যথিত হয়ে বললেন, “হে প্রভু! এটি তো অত্যন্ত কম। আমার আয়ু থেকে তাঁকে চল্লিশ বছর দান করে দিন যাতে তাঁর আয়ু একশত বছর পূর্ণ হয়।” [সুনান আত-তিরমিযী, হাদীস: ৩০৭৬]

আল্লাহ আদম (আ.)-এর এই আবেদন কবুল করলেন। এভাবেই দাউদ (আ.)-এর আয়ু একশত বছর পূর্ণ করা হলো। তবে এই দানের বিষয়টি আদম (আ.) যখন পার্থিব জীবনে বৃদ্ধ অবস্থায় পৌঁছেছিলেন, তখন এক কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনার জন্ম দিয়েছিল।

৩৮শ অধ্যায়: আদম (আ.)-এর পরবর্তী এক হাজার বছরের ভবিষ্যৎ দর্শন
আল্লাহ তা‘আলা আদম (আ.)-কে কেবল তাঁর বংশধরদের রূহ দেখাননি, বরং তাঁর সামনে ভবিষ্যতের এক দীর্ঘ সময়পঞ্জি উন্মোচন করেছিলেন। তিনি স্বপ্ন বা ওহীর মাধ্যমে দেখতে পাচ্ছিলেন কীভাবে তাঁর বংশধররা ভাষা ও বর্ণে বিভক্ত হবে। তিনি দেখেছিলেন নূহ (আ.)-এর প্লাবন, ইবরাহীম (আ.)-এর অগ্নিপরীক্ষা এবং শেষ নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর নূরাণী যুগ।

আদম (আ.) বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই পৃথিবী একটি সরাইখানা মাত্র। এখানে মানুষ আসবে এবং একটি নির্দিষ্ট সময় কাটিয়ে আবার তার আদি নিবাস জান্নাতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করবে। তিনি তাঁর পরবর্তী এক হাজার বছরের ভবিষ্যৎ অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেছিলেন।

তিনি তাঁর সন্তানদের অসিয়ত করতেন যে, পৃথিবী যেন তাদের গ্রাস করতে না পারে। তিনি বলতেন, “আমি জান্নাত দেখে এসেছি, সেখানকার সুখ চিরস্থায়ী। আর পৃথিবীর এই কষ্ট ক্ষণস্থায়ী।” তাঁর এই ভবিষ্যৎ দর্শন ও দূরদর্শী শিক্ষাগুলোই পরবর্তী প্রজন্মের জন্য হেদায়াতের পাথেয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

« <
/ 40
> »